চে

অক্টোবর ১৯৬৭, বলিভিয়ার লা হিগুয়েরার উত্তরে এক স্কুল ঘর। হাত-পা বাঁধা অবস্থায়, বাঁ পায়ের মাসলে গুলিবিদ্ধ অবস্থায়, দেওয়ালে ঠেস দিয়ে কোনরকমে বসে আছেন একজন লোক, রক্ত-কাদায় মাখামাখি মুখ, ছেঁড়া জামাকাপড়, নিদ্রাহীন, অনাহারক্লিষ্ট শরীর, ক্রমাগত বিশ্বাসঘাতকতায় ক্লান্ত-অবসন্ন মন। সামনেই ধুলোভর্তি মেঝেয় পড়ে রয়েছে দুই দীর্ঘদিনের বন্ধু, সহযোদ্ধা, আন্তোনিও ও আর্তুরো– নিথর, রক্তাক্ত। লোকটি, ডঃ আর্নেস্তো গুয়েভারা দ্য লা সেরনা, পৃথিবী তাঁকে চেনে ‘চে’ বলে। দুজন সেনাকর্তাকে দেখে উঠে বসতে চেষ্টা করলেন, তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য। নিঃশেষিত, শারীরিকভাবেই শুধু, কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরেই বুঝিয়ে দিলেন, একটুও চিড় ধরেনি আত্মবিশ্বাসে, একটুও টাল খায়নি আদর্শ।

— তুমি কিউবান, না আর্জেন্টাইন?

— গোটা লাতিন আমেরিকাই আমার স্বদেশ, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকার যেকোন নিপীড়িত মানুষ আমার বন্ধু, আমার সহযোদ্ধা।

— ডাক্তার হয়েও এপথে এলে কেন?

— দু একটি ডাক্তারি গবেষনায়, কয়েকজন রোগীর চিকিৎসায় সমাজের কল্যাণ হত হয়ত, সামগ্রিকভাবে সমাজের উন্নতি করা যেত না। সমস্ত মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে হলে, গোটা সমাজব্যবস্থা বদলাতে হবে, মানুষকে মুক্তি দিতে হবে দুঃখ, দারিদ্র, শোষণ থেকে।

— এই মুহূর্তে কি মনে পড়ছে, আর্জেন্টিনা, ছেলেবেলা, না কিউবার কথা?

— লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত জনগণের কথাই মনে পড়ছে। আমি তাদের মুক্তি দিয়ে যেতে পারলাম না।

— তুমি তাহলে নিজের অসহায়ত্বের কথাই ভাবছ?

— না, আমি ভাবছি বিপ্লবের অমরত্বের কথা।

এরপর যখন এক মদ্যপ, অপ্রকৃতিস্থ সৈনিককে পাঠানো হল তাঁকে গুলি করার জন্য, তিনি বললেন, “যদি আমাকে মারতেই এসে থাক, তবে কর গুলি, কাপুরুষ, তোমরা শুধু একটা মানুষকেই মারতে চলেছ।”

তিনি জানতেন কয়েকটা বুলেট একটা শরীরকেই মারতে পারে শুধু, আদর্শের মৃত্যু হয় না। তিনি জানতেন,– “আমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই জন্ম হবে আমার।”
      ১৯২৮, ১৪ই জুন, তিনি জন্মেছিলেন আর্জেন্টিনায়। এ জন্য কি আর্জেন্টাইন বলা যায় তাঁকে? কখনই নয়, তিনি যে যথার্থ বিশ্বনাগরিক পরবর্তীকালে কাজে ও কথায় তার প্রমাণ দিয়ে গেছেন। মা ছিলেন মার্ক্সবাদী চিন্তায় দীক্ষিত, মার থেকেই প্রভাবিত হন তিনি। দেশের মানুষ কিভাবে বেঁচে আছে, কিভাবে দিন কাটাচ্ছে, কিভাবে তাদের অবস্থার উন্নতি করা যায়, জানার আগ্রহ ছিল প্রবল। স্কুলে পড়ার সময় ১৩ বছর বয়সে সাইকেলে ঘুরে এলেন আর্জেন্টিনা, সঙ্গী এক বন্ধু, পঁচাত্তর পেসো, স্কুলের শিক্ষকদের লিখে দেওয়া একটি পরিচয়পত্র, আর অনিয়ন্ত্রনযোগ্য হাঁপানির টান। এরপর, ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হয়ে যাওয়ার পরও পায়ে হেঁটে ঘুরেছেন বিভিন্ন প্রদেশ। ১৯৫৯ এ আলবার্তো গ্রানাদো এবং চে, মোটরবাইকে চেপে ঘুরে এলেন গোটা লাতিন আমেরিকা, মোটরবাইক অবশ্য অর্ধেক রাস্তায় খারাপ হয়ে যায়, বাকি রাস্তায় পায়ে হেঁটে বা হিচ-হাইক করে। স্কুলে পড়াকালীনই রাজনীতিতে উৎসাহী অংশগ্রহণ, কর্ডোভা প্রদেশে তরুণ জাতীয়তাবাদী দলে যোগ দেন। অ্যাজমায় আক্রান্ত, দুর্বল ‘চে’-কে বিপ্লবের অযোগ্য বলে মনে করতেন সঙ্গীরা। সে জন্যই কঠোর অধ্যবসায়, জয় করতেই হবে শারীরিক প্রতিকূলতা। পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান শ্রমিক-কৃষক বস্তিতে, মিশে যান তাদের মধ্যে, তাদেরই একজন হয়ে। তিনি দেখলেন, দেশের মানুষ একটা কৃত্রিম জীবনযাপন করছে, জীবনধারণের ন্যূনতম রসদটুকুও জোগাড় করে উঠতে পারছে না অনেকে। একই চিত্র গোটা লাতিন আমেরিকায়। তাঁর চোখে তখন মুক্তির স্বপ্ন, শোষিত মানুষের মুক্তি, গোটা লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকার মুক্তির স্বপ্ন। রাশিয়া স্বপ্ন দেখাচ্ছে, স্বপ্ন দেখাচ্ছে চীন। পারিবারিক জীবনেও নানা প্রতিকূলতা, অভাব, ঔদাসীন্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য নানা কারণে বাবা মা বিচ্ছিন্ন হলেন, ভাইবোনের দেখাশোনার দায়িত্ব এসে পড়ল তাঁর উপর, মা চাইলেন না ‘চে’ ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিক। পড়ার সাথে সাথে পার্টটাইম কাজ করতে থাকলেন, উচ্চমানের মেধার পরিচয় দিয়ে ছয় বছরের পড়া তিন বছরে শেষ করলেন। ডাক্তারি পড়ার সময় গবেষণা ছাড়া অন্য কিছু মাথায় ছিলনা, কিন্তু দেশভ্রমণের অভিজ্ঞতা পাল্টে দিল চিন্তাভাবনা। লাতিন আমেরিকার আর্ত মানুষের ডাক যেন ঘুমোতে দিচ্ছে না তাঁকে। গুয়েতেমালায় গেলেন সেখানকার দুরবস্থার কথা শুনে। সেখানকার সরকারি মনোভাব, কমিউনিস্ট পার্টির কার্যকলাপ তাঁর পছন্দ হল না। তিনি বুঝতে পারছিলেন শুধু সেনাবাহিনী দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের অভ্যুত্থান ঠেকানো যাবে না, জনগণের হাতে অস্ত্র দিতে হবে, হোমগার্ড বাহিনী গঠন করতে হবে। গণতান্ত্রিক আরবানজ সরকারকে রক্ষা করতে যুব কমিউনিস্ট মিলিশিয়ায় যোগ দিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিলেন। কিন্তু সিআইএর ক্রমাগত উস্কানি এবং প্রত্যক্ষ সহযোগে সমাজবিরোধীরা সফল হল, শেষরক্ষা হল না। পরাজিত, ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সদ্যপরিচিত কজন কিউবান বিপ্লবীর সঙ্গে চলে গেলেন মেক্সিকো। যাওয়ার সময় বললেন আমার স্লোগান হল, “ছোট ঝোলা, শক্ত পা, আর ফকিরের পাকস্থলী।” কিছুদিন সেখানে পাহারাদার থেকে সহকারী গবেষক, বিভিন্ন পেশায় কাজ করলেন। এই মেক্সিকো ভ্রমণও চে’র ভাষায়, “রাজনীতির স্টেথোস্কোপে লাতিন আমেরিকার নাড়ি দেখা।” সেখানেই রবার্তো ফেসিরেসের মাধ্যমে আলাপ ফিদেল ও রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে। এক বিশ্বাসঘাতকের জন্য গোপন আশ্রয় ও প্রশিক্ষনস্থল এক খামারবাড়ি থেকে ধরা পড়লেন ফিদেল-চে সহ অন্যান্যরা। মেক্সিকান পুলিশকে টাকা দিয়ে পালালেন তাঁরা। ১৯৫৬, ২৫শে নভেম্বর টুক্সপান বন্দর থেকে সূচনা হল ‘গ্রানমা’ অভিযানের। চে বললেন–“হয় আমরা স্বাধীন হব, নয়ত শহীদ হব।” একের পর এক সামরিক ঘাঁটি আক্রমণ, জয়লাভ, জনগণের আস্থা অর্জন, বিপ্লবী দল এগিয়ে চলল। সিয়েরা মায়েস্ত্রোয় অনেকখানি মুক্তাঞ্চল তৈরি হয়েছে, হাসপাতাল, রুটির কারখানা,খামার, চুরুট, চামড়ার কারখানা স্থাপিত হল। ১৭ জুলাই সবাই মূল ঘাঁটিতে ফিরে এলে চে কে কম্যান্ডান্ট ঘোষণা করা হল। চে’র দায়িত্ব হল, গেরিলাবাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষা, শত্রুদের বিভ্রান্ত করা, কুখ্যাত মানচেজ মোসকেরার বাহিনীকে পরাস্ত করা। চে সাফল্যের সঙ্গে এই বাহিনী নিশ্চিহ্ন করেন, কৃষি সংস্কার, ভূস্বামীদের থেকে কর আদায় করতে থাকেন। যুদ্ধক্ষেত্র ক্রমশ বিস্তৃত হয়, একের পর এক সামরিক ঘাঁটি আক্রমণ ও বিজয়, বিপ্লবীরা জনসমর্থন পেতে থাকেন। এর মধ্যে একাধিকবার চে’র মৃত্যুসংবাদ প্রকাশিত হয়। চে’র বাহিনী সান্তা ক্লারা দখল করে। বাতিস্তা সরকার মরিয়া হয়ে চরম প্রতিক্রিয়াশীল ওঠে। এতে বিপ্লবীদের প্রতি সমর্থন আরো বাড়ে, সাংবাদিকরা আসেন, সেনাবাহিনীর একাংশ ফিদেলের সঙ্গে যোগ দেয়। চে’র বাহিনী সান্তা ক্লারা দখল করে। চে সেনাপ্রধানের প্রতি আত্মসমর্পণ করে রক্তপাত এড়ানোর আহবান জানান। ২রা জানুয়ারি হাভানা দুর্গের আত্মসমর্পণে বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠিত হল। চে বললেন, “আমাদের বিপ্লব এই শিক্ষা দেয় যে জনগণ সমর্থিত একটি ছোট দল যদি মৃত্যুকে জয় করার সাহস দেখায়, তবে সুশৃঙ্খল একটি বড় সেনাবাহিনীকেও ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে।” বিপ্লবী সরকারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এবং অর্থমন্ত্রী হলেন চে। বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ করলেন, ফোর্ট নক্স থেকে কৌশলে কিউবার সম্পত্তি সরিয়ে সেগুলো মার্কিনিদের হাত থেকে সুরক্ষিত করলেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করলেন কিউবা পুনর্গঠনে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কিউবার প্রতিনিধিত্ব করে তুলে ধরলেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ।কিন্তু বিপ্লবী মন তৃপ্ত হল না। তাঁর কাছে কিউবার বিজয় তো ‘লাতিন আমেরিকা বিজয়ের প্রথম ধাপ’, তিনি এতে সন্তুষ্ট থাকেন কি করে? সমস্ত ছেড়ে আবার বেরিয়ে পড়লেন অজানার উদ্দেশ্যে। তাঁর প্রথম পছন্দ ছিল লাতিন আমেরিকারই কোন দেশ, কিন্তু ফিদেলের পীড়াপীড়িতে চলে গেলেন কঙ্গো। সেখানে সাংগঠনিক কাজ খুব ভাল এগোল না, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিরোধিতা, কৃষক শ্রেণীর সন্দেহ, সর্বোপরি কমিউনিস্ট পার্টির অসহযোগিতা বিপ্লবকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিল। বহুদিন জনসমক্ষে চে’র অনুপস্থিতি, সোভিয়েত প্রসঙ্গে ফিদেলের সঙ্গে মতবিরোধে নানা সন্দেহ তৈরি হচ্ছিল। তার অবসান ঘটাতে ও জনমানসে চে’র ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল করতে গিয়ে একটি ভুল করলেন ফিদেল, চে’র শেষ চিঠি জনসমক্ষে পড়ে শোনালেন। এতে সিআইএ সতর্ক হয়ে গেল। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে চে’র একটা দূরত্বও তৈরি হল। তারা বিপ্লব সফল করে ঘরে ফিরে যেতে আগ্রহী, চে’র স্বপ্নে ফিরে যাওয়ার কোন উল্লেখই নেই! চে সঙ্গীদের ফেরত পাঠিয়ে আমৃত্যু থেকে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সকলের চাপে শেষ পর্যন্ত গোপনে হাভানায় ফিরে যান। আগে অবশ্য কঙ্গোর দূতাবাসে ব্যর্থতার পর্যালোচনা করে একটি বই লেখেন, ছ মাস সেখানেই থাকেন। হাভানায় ফিদেল এবং অন্যান্যদের সঙ্গে আলোচনায় পরবর্তী গন্তব্য স্থির হয় বলিভিয়া। ঠিক হল ১৭ জন কিউবান বিপ্লবীকে নিয়ে চে যাবেন বলিভিয়ায়, ওখানকার কমিউনিস্ট পার্টির সহায়তায় গেরিলা দল গড়ে তোলা হবে। সেইমত কাজ শুরু হল, বেসক্যাম্পে তখন ২৪ জন। অনেক পরে যোগ দিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি মাঞ্জো। কাজ এগোনোর সাথে সাথে মাঞ্জোর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা সেরে ফেললেন চে। মাঞ্জো একটু ঘাবড়ে গেলেন, তিনি শুধুমাত্র বলিভিয়ার ক্ষমতা দখল নিয়ে আগ্রহী, এদিকে চে বলিভিয়াকে দেখছেন লাতিন আমেরিকার মুক্তির একটি সোপান হিসাবে। তিনি আশঙ্কা করলেন বিপ্লবী সরকার গঠিত হলে তিনি হয়ত সম্পূর্ণ ক্ষমতা করায়ত্ত করতে পারবেন না, তিনি গেরিলাবাহিনীর কতৃত্ব দাবি করে বসলেন। চে একজন অনভিজ্ঞের হাতে দায়িত্ব ছাড়তে রাজি না হওয়ায় তিনি বেরিয়ে গিয়ে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। সরকারের হাতে সমস্ত তথ্য তুলে দিতে থাকলেন, ঘোষণা করলেন গেরিলা দলের সংশ্রবে থাকলে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের বহিষ্কার করা হবে এবং গেরিলাদলের বিরুদ্ধে ক্রমাগত প্রচার চালিয়ে গেলেন কৃষকদের মধ্যে। উপরন্তু সিআইএ প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করতে থাকল সরকারি সেনাবাহিনীকে। গেরিলাবাহিনী এই দ্বিমুখী আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে গেল। চে লড়াই ছেড়ে পালানোর কথা ভাবলেন না। তিনি মনে করতেন তাঁর থেকে,তাঁর আদর্শের বেঁচে থাকা বেশি প্রয়োজনীয়, তাই সমাজতন্ত্রের পতাকা ত্যাগ করলেন না। নিজের জীবন উৎসর্গ করে পতাকাটা তুলে দিতে চাইলেন আগামী প্রজন্মের হাতে। তিনি বলতেন, “মৃত্যু আমাদের বিস্মিত করে, তবুও তাকে স্বাগত, যদি আমাদের আহ্বান একটিও উৎসুক কানে পৌঁছায়, একটিও হাত এগিয়ে আসে আমাদের রাইফেলগুলো তুলে নেওয়ার জন্য।”

    নিপীড়িত মানুষের আর্তি যেন সর্বক্ষণ কানে বাজত, চোখের সামনে দেখতেন নির্লজ্জ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, স্বপ্ন দেখতেন লড়াই করে তাকে পরাস্ত করার। স্বপ্ন দেখতেন গড়ে তোলার ‘এক, দুই, অনেক ভিয়েতনাম’। স্বপ্ন দেখায় কোন দেশ সীমানা ছিল না। তেমনি সীমা ছিল না আত্মত্যাগের। তিনি জানতেন, “আমরা জীবনে কোন কিছু পেতে পারি না, যতক্ষণ না আমরা তার জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত থাকি।” ব্যক্তিগত সুখ, স্বাচ্ছন্দ, বৈভব, বিলাস, পছন্দ সর্বোপরি নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন বিপ্লবের ডাকে, স্বপ্নকে বাস্তব করার অদম্য ইচ্ছায়, এক উন্নততর সমাজের স্বপ্নে। চে’র স্বপ্ন কিন্তু এখনও অধরাই। চে তাঁর পতাকা কারো  হাতে তুলে দিয়ে যেতে পারেননি, পুঁতে রেখে গিয়েছেন নিজের রক্তে ভেজা মাটিতে। যে ই উঠিয়ে নেবে সেই পতাকা, সেইই পাবে বিপ্লবের উত্তরাধিকার। তিনি তো বলেইছিলেন,– “যদি প্রত্যেক অবিচারে ঘৃণায়, ক্রোধে কেঁপে ওঠ, তবে তুমি আমার সহযোদ্ধা।”

ফেসবুক সংগৃহীত রচনাবলী

বর্তমানকালে জ্ঞানলাভ অত্যন্ত সহজ একটি প্রক্রিয়া, অন্তর্জালীয় মাধ্যমে আঙ্গুলের কেরামতিতে নিমেষব্যয়ে যেকোন বিষয় সম্বন্ধে অশেষ তথ্য পাওয়া সম্ভব। তদুপরি,ফেসবুক,প্রভৃতি মঞ্চ জগতের প্রায় সকল বিদ্বজনকে একত্রিত করিতে পারায় তাহাদিগের জ্ঞানগর্ভ আলোচনার প্রসাদ পাইয়া মোর ন্যায় কাষ্ঠমূর্খের দল বিশেষ লাভবান হইয়া থাকে। এক্ষণে এ গৌরচন্দ্রিকার কারণ ব্যক্ত করি, আমি কিছুকাল যাবৎ  অন্তর্জালীয় গুণীজনেদের সঙ্গলাভ করিয়া বিভিন্ন বিষয়, বিভিন্ন সময় সম্পর্কে যে সমস্ত জ্ঞানলাভ করিয়াছি, তাহার কিছু চিত্তাকর্ষক অংশ আমি জাতির উদ্দেশ্যে নিবেদন করিতে মনস্থ করিয়াছি, সে জন্যই প্রথমেই গুণীজনের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিলাম। আমি এগুলিকে সংখ্যা চিহ্নিত অনুচ্ছেদে বিভাজিত করিয়া লিপিবদ্ধ করিলাম, তাহাতে মূর্খের সুবিধা হইবে বোধ করি। গুণীজনে যাহা বলিয়া থাকেন তাহা পুঙ্খানুপুঙ্খ উদ্ধৃত করিবার ক্ষমতা নাই, তবে তাহা কিছু এইপ্রকারই, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।

১. লেনিন বেনামে অনেক সম্পত্তির অধিকারী ছিলেন, স্তালিন তাঁকে হত্যা করিয়া সেইসব দখল করেন। বর্তমানে উত্তরাধিকার সূত্রে এম কে স্তালিন সেইসব পাইয়াছেন।

২. চে গুয়েভারা একজন আমেরিকান রকস্টার, দেশবিরোধী গান লেখার কারণে বিতাড়িত হইয়া কিউবায় আশ্রয় নেন।

৩. ফিদেল কাস্ত্রো কলগার্লদের সঙ্গে সমস্ত রাত্রি, এবং বেসবল খেলিতে সমস্ত দিন অতিবাহিত করিতেন।ফিদেল একজন আমেরিকার মদতপুষ্ট লুম্পেন শাসক ছিলেন। তবে তিনি যে এতকাল জীবিত ছিলেন, তাহা তাঁহার মৃত্যুতেই অনেকে জানিলেন।

৪. কমিউনিস্ট শাসকরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত স্বৈরাচারী, লুম্পেন চরিত্রের হইয়া থাকেন। ইহা ভিন্ন বাকি সমস্ত নেতাদের কাহারও চরিত্রের দোষ নাই,কোন নেশা নাই, অত্যন্ত গণতন্ত্রপ্রিয়, নির্লোভ হইয়া থাকেন। কমিউনিস্টরা আসলে একধরনের ডাকাত, ইহাদের সংস্রব জঙ্গিগোষ্ঠীর ন্যায় পরিত্যাজ্য।

৫. আমেরিকার সকল প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত সচ্চরিত্র, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হইয়া থাকেন। ইহারা সকল দেশের কথা ভাবেন বলিয়াই মাঝেমধ্যে একটু-আধটু বোমা-গুলি বৃষ্টি করিয়া পশ্চাৎপদ দেশগুলিকে সাহায্য করিয়া থাকেন।

৬. গ্লোবাল ওয়ার্মিং আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের উন্নতির গতিরোধ করিবার চক্রান্ত মাত্র। ওজোন স্তরে ছিদ্র হইলেই তো বিকিরিত রশ্মি অবাধে নির্গত হইয়া যায়, তাহলে আর উষ্ণতা বৃদ্ধি হয় কিরূপে?

৭. প্রচুর পরিমাণ নূতন নোট ছাপিলেই অর্থনীতির সকল সমস্যার সমাধান হয়। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা নিতান্ত নির্বোধ বলিয়াই এইপ্রকার একটি সহজতম পথ ছাড়িয়া অযথা বিষয়টিকে জটিল করিয়া তোলেন।

৮. মানবেতিহাসের সর্বাধিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা হইলেন নরেন্দ্র মোদী, এই কারণেই তিনি সমস্ত সিদ্ধান্ত একাই গ্রহণ করিয়া থাকেন, ও মাঝেমধ্যে কুপমণ্ডূকদের সমালোচনা কুড়াইয়া থাকেন। একান্ত তাঁহার চিন্তার সঙ্গে dynamically তাল রাখিতে পারে না বলিয়াই নোবেল কমিটি…

৯.আমেরিকা সাক্ষাৎ স্বর্গ, সেইস্থানে লোকে যাহা বাসনা তাহাই পাইয়া থাকে, যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারে, ওইস্থানে কোন কিছুরই অভাব নাই, কোন বদপ্রকৃতি লোক নাই, সকলের অবাধ স্বাধীনতা। মুসলিম দেশগুলিতে অবশ‍্য বিপরীত অবস্থা, যদিও উহারা বিধর্মী দেখিলেই ভক্ষণ করিয়া থাকে, তাহার জন্যই উহাদের সঙ্গে ‘আক্রমণই সর্বোৎকৃষ্ট প্রতিরক্ষা’ নীতি গ্রহণ করা উচিত।

১০. ভারতীয় উপমহাদেশ অতীতে জ্ঞানে বিজ্ঞানে অতীব উন্নত ছিল, সেকালে উড়োজাহাজ তো শিশু, Time machine, Teleportation পর্যন্ত আবিষ্কৃত হইয়াছিল। মেঘনাদের রথ UFO র নিদর্শন, ব্রহ্মাস্ত্র প্রকৃতপক্ষে Ballistic missile, teleporting এর দৃষ্টান্ত তো পুরাণে মুহুর্মুহু।

১১.পুরাণে সর্বরোগের ঔষধ বিবৃত করা আছে, শরীরে গোবর লেপন করিলে সমস্ত তেজস্ক্রিয় রশ্মি হইতে রক্ষা পাওয়া যায়। বিশল্যকরণীর সহিত মধু মিশ্রিত করিয়া পুণ্যচিত্তে সেবন করিলে কর্কটরোগ নিরাময় হইয়া থাকে।

১২.বাস্তুমতে বাড়ি করিলে তাহা ঝঞ্ঝা-ভূমিকম্প-বন্যায় অটুট থাকে। জ্যোতিষবিদ্যা হইল একমাত্র সত্য, চাঁদের আকর্ষণে নদীর জল ফুলিয়া উঠে, কাহারও কপাল ফুলিয়া উঠাও অসম্ভব নহে। সঠিক রত্নধারণে বিশ্বজয় করা সম্ভব। চাঁদে মানুষের পদার্পণ মিথ্যাপ্রচার, চাঁদ বলিয়া যাহার ছবি প্রচার করা হইয়া থাকে, তাহা প্রকৃতপক্ষে চন্দ্রদেবের দুর্গের প্রাচীরমাত্র।

১৩. ডারউইনের বিবর্তনবাদ উন্মাদের প্রলাপ, মানুষ মানুষরূপেই আবির্ভুত হয়, তাহার পূর্বে ছিলেন শুধু ব্রহ্মা, প্রাণী ছিলেন গোরু, অর্থাৎ গোমাতা।

১৪. ১৩ অত্যন্ত অপবিত্র সংখ্যা, অমঙ্গল আশঙ্কায় এই অনুচ্ছেদটি নিয়মরক্ষার ন্যায় যোগ করা হইল।
কেহ যদি সম্পূর্ন না পড়িয়াই সমালোচনা, বিচার, মন্তব্য করেন, তাহা অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হইবে, কারণ বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী কোন বিষয় সম্পর্কে সামান্যতম ধারণাহীন ব্যক্তির মতামতই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূূর্ণ বলিয়া গণ্য হইয়া থাকে। সেই কারণে কোন রচনা সম্পর্কে তাহার মতামতই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, যিনি সেটি পড়েন নাই।