কক্ষচ্যুত

ছোট্ট জানলাটা দিয়ে একটুকরো আকাশ কোনফাঁকে ঢুকে পড়েছে একচিলতে ঘরটায়, কেউ টের পায়নি; আপনিই কি পেয়েছিলেন কমরেড মনোতোষ? আপনি তো আপনার ক্ষীণ হয়ে আসা দৃষ্টির সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তাকিয়ে ছিলেন ঘড়িটার দিকে; ক্লান্ত, বিষণ্ণ, যে ঘড়িটা প্রহর গুনছিল আপনার হয়ে। একদৃষ্টিতে আপনি চেয়ে দেখছিলেন কিভাবে সে একটু একটু করে আপনাকে এগিয়ে দিচ্ছে মৃত্যুর দিকে, তাই না? হ্যাঁ মৃত্যু; অনাড়ম্বর, আবেগহীন, একান্ত তুচ্ছ, ক্ষুদ্র একটা মৃত্যু। অথচ, এরকম তো হবার কথা ছিল না। ঘড়িটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে, ছোট্ট জানলাটার, জানলার সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে বসে থাকা একলা, বেমানান কাকটার দিকে তাকিয়ে এটাই বলবেন তো মনে মনে? হয়ত ঠিকই, কিন্তু আপনি কি বুঝতে পারেননি এরকমটাই হতে চলেছে? একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে সবকিছু? বিশ্বাসের জ্বলন্ত মশালের মত মুখগুলো হারিয়ে যাচ্ছে চারপাশ থেকে, বিজ্ঞাপনের মত কৃত্রিম সুন্দর হাসিমুখের ভিড়ে, রক্ত লাল রঙে লেখা সেই দেওয়াল লিখন গুলো সিনেমার পোস্টারে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে, দেখতে পাননি? নাকি, দেখতে চাননি? দেখতে চাননি, কারণ কি আপনিও একটু একটু করে বদলে গেছেন মনোতোষবাবু? বদলাননি?

        সকলে মিলে মুক্তির দশক রচনার স্বপ্নে যখন কাগজ, কলম, বন্দুক হাতের কাছে যা পেয়েছেন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন, তখন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আজকের দিনটাকে কি এইভাবেই দেখতে পেতেন? নকশালবাড়ির যে আগুন বুকে করে শ্রীকাকুলামে, চম্পারণে, সারা ভারতে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, সে আগুন আজ কোথায়, মনোতোষবাবু? নিজেকে নিঃশেষ করে উৎসর্গ করার অঙ্গীকার করেছিলেন না নবযুগের কাছে? মাসিক জমা-খরচ, লাভ-লোকসানের হিসাবে মশগুল হয়ে ভুলেই গেলেন সে কথা? নাকি, সে অঙ্গীকারেও লাভ-লোকসানের হিসাব মিশে ছিল মনোতোষবাবু? সত্যিই কি নিজেকে ছাপিয়ে গিয়ে ভাবতে পেরেছিলেন সমাজের সঙ্গে মিশে, নাকি বিপ্লবকে সুরক্ষিত বার্ধক্য জীবনের প্রভিডেন্ট ফান্ড হিসাবেই দেখছিলেন? ঠিকই বলেছিল না সরোজ, “মধ্যবিত্ত প্রতিবাদ করে কিছু না পাওয়ার যন্ত্রণা থেকে, সামান্য কিছু পেয়ে গেলেই স্থিতাবস্থায় ফিরতে চায়”? মনে পড়ে সরোজকে? রাধানাথ মিত্রের ছেলে সরোজ, ‘সমাজবিরোধী’ হওয়ার অপরাধে চটকলের মালিক রাধানাথবাবু ১৯ বছর বয়সে যাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন? মিহিরদা একবার যার সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন- “স্রেফ আগুন দিয়েই তৈরি”? মনে পড়ছে না? সেই ‘উগ্রপন্থী’, ‘হঠকারী’, ‘নৈরাজ্যবাদী’ সরোজ; পরবর্তীকালে এগুলোই তো বলতেন লোকসমক্ষে। কে জানে, হয়ত বিশ্বাসও করতেন। হ্যাঁ, ‘উগ্রপন্থী’ সরোজ। সেই ঘটনাটা এখনও মনে আছে? মনে আছে চটকলের স্পিনার শম্ভুকে? মজুর ছাঁটাই করে, বাড়তি কাজ বিনা পারিশ্রমিকে অন্য মজুরদের ঘাড়ে চাপানো যাবে না, এই দাবি নিয়ে ধর্মঘট বাধিয়েছিল কারখানায়। মালিক রাধানাথবাবু কারখানার গেটের সামনে গালাগাল দিয়ে, গায়ে থুথু ছিটিয়ে দিয়েছিলেন, উপযুক্ত শিক্ষা দেবেন বলে শাসিয়ে গিয়েছিলেন। মনে আছে, শম্ভু কি বলেছিল উত্তরে? আপনিও ছিলেন না ওদের ভিড়ে, ওদেরই ‘কমরেড’ সেজে? ক্লাস ফোরে ফার্স্ট হয়ে স্কুল ছেড়ে দেওয়া, ‘অশিক্ষিত’ শম্ভু অবিচলিত কণ্ঠে বলেছিল-“গালাগাল দিতেই পারেন আপনি। ওটাই আপনার, আপনাদের আসল চরিত্র, ভয় পেয়ে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। তবে উপযুক্ত শিক্ষা আমাকে যতই দিন, মনে রাখবেন আমি একা নই।” সেদিন ওখানে দাঁড়িয়ে আপনার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল, মনে পড়ে?

        সেদিন সরোজ আর মিহিরদার মধ্যে কত তর্ক হয়েছিল রাত্রে, সমীরদের বাগানবাড়িতে। সরোজ বোঝাতে চাইছিল- “এই তো ঝাঁপিয়ে পড়ার সময়, মজুরদের ঘুম ভেঙেছে, এখন ওদেরকে তো সংগঠিত করে তুলতে হবে।” মিহিরদার ধীর, শান্তকণ্ঠে উত্তর ছিল, “মজুরেরা জেগে উঠে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে, নিজেদের আন্দোলনের রাশ নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে, এসময় আমরা ওদের সমর্থন করব, সাহায্য করব, কিন্তু ওদেরকে আমরা নিয়ন্ত্রন করতে গেলে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যাবে সরোজ। এই স্বতঃস্ফূর্ত শক্তির জোয়ার সব বাধা গুঁড়িয়ে দিয়ে, নিজের পথ নিজেই তৈরি করে নেবে দেখো। বিপ্লব কারও নির্দেশ মেনে আসে না, তার প্রয়োজনও হয় না।”

        কিন্তু যা ভাবা হয়েছিল, ঠিক সেটা হয়নি। চারদিনের মাথায় শম্ভুকে একটা ভ্যানের উপর পাওয়া গেছিল, গলাটা আড়াআড়ি ভাবে চেরা, ডান হাত নেই, একেবারে উপযুক্ত শিক্ষিত অবস্থায়। তার দু-সপ্তাহের মধ্যে নিজের বসার ঘরে রাধানাথবাবুকে কেউ পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করেছিল। আপনি তো জানেনই।

        জানেন না? মনে পড়ছে না? নাকি বলতে চাইছেন আপনার জানার কথা না, অস্বীকার করছেন? আপনি অস্বীকার করেই সরোজকে মুছে ফেলতে পারবেন? সরোজের দাদা বিনয়ও কি পেরেছিল? সরোজদের সাম্যকিভাবে সরিয়ে দেওয়া যায়, মুছে ফেলা যে যায় না মনোতোষবাবু। ওরা যে সময়ের যোদ্ধা; ওদের পথ ঠিক ছিল না ভুল সে বিচার সময় অবশ্যই করবে, কিন্তু সময় যে ওদের নিঃশব্দে মুছে যেতে দেবে না মনোতোষবাবু। মারা যাওয়ার, বা খুন হয়ে যাওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় কি বলেছিল সরোজ, মনে আছে? আপনি ছিলেন, কানাই, খোকন, সমীর, কল্যাণ আরও কয়েকজন ছিল, না? সরোজ জানত, কোল ইন্ডিয়ার বড় চাকুরে বিনয় সবসময় আশঙ্কায়, অস্বস্তিতে থাকে, কখন তার সমাজবিরোধী ভাইয়ের কীর্তিকলাপ তার কেরিয়ারে কালি লেপে দেয়। রাধানাথের ঘটনাটার পর, সে এই কাঁটাটা উপড়ে ফেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু তবু সরোজ বলেছিল, “লড়াইটা বিনয়ের সঙ্গে সরোজের নয়, রাধানাথের সঙ্গে সরোজেরও নয়, লড়াইটা একটা শ্রেণীর সঙ্গে আরেকটা শ্রেণীর। মনে পড়ছে? আর কি বলেছিল? শ্রেণীবিভক্ত সমাজে সমস্ত নৈতিকতাই শ্রেণী নৈতিকতা, ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর জন্য ভিন্ন ভাবে প্রযোজ্য হয়। আপনাকে বলেছিল, হ্যাঁ আপনাকেই, কমরেড মনোতোষ, এই যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কোনরকম ইতস্তত করা মধ্যপন্থী বিচ্যুতির লক্ষণ। আপনি কি বিচ্যুত হননি, কমরেড মনোতোষ?
মনে পড়ে, জানুয়ারির এক রাত? এক ভাঙা মন্দিরের সংলগ্ন ঝোপঝাড়ে অপেক্ষা করছিল দুটো রাইফেল। আর তিনজন লোক অপেক্ষা করছিল গভীর রাত্রির জন্য। তিনজন, নাকি চারজন? সমীর, কল্যাণ, খোকনের সঙ্গে আপনারও যাওয়ার কথা ছিল না? কিন্তু আপনি গেলেন না। বস্তির নাইট স্কুলে আপনার ছাত্র জহিরুলের মাধ্যমে আপনি জানতে পেরে গিয়েছিলেন আসন্ন বিপদের কথা। আপনি যাননি। আপনি যাননি আপনার কমরেডদের সাবধান করে দিতে, তার বদলে আপনি পালিয়েছিলেন, মনোতোষবাবু, কমরেডদের বিপদের মুখে ফেলে।

        হয়ত আপনি তাদেরকে কমরেড ভাবতেই পারেননি। তাই পোস্টঅফিসের চাকরিটা জোগাড় করে দিয়ে বড়মামা যখন বলেছিলেন, “রাজায় রাজায় যুদ্ধে উলুখাগড়ার মত প্রাণটা দিবি কেন বল?” তখন তাকে বলতে পারেননি যুদ্ধটা ‘রাজায় রাজায়’ ছিল না। হয়ত, আপনি সেই যুদ্ধটাকে নিজের রক্তের মধ্যে অনুভব করতেই পারেননি, নিজেকেও অনুভব করতে পারেননি একটা বিশাল জনসমুদ্রের অংশ রূপে।

        আসলে আপনার বৃত্তটা আস্তে আস্তে চোট হয়ে আসছিল মনোতোষবাবু, আপনার অতি আধুনিকা সুন্দরী সহপাঠিনী প্রীতির সঙ্গে সম্পর্কটায় জড়িয়ে পড়ার পর, আপনার ভালবাসার পরিসর ছোট হয়ে যাচ্ছিল আস্তে আস্তে- বিশ্বপ্রকৃতি থেকে, মানুষ থেকে, পার্টি থেকে গুটিয়ে কেন্দ্রীভূত হচ্ছিল মাত্র দুটো মানুষের উপর, আপনি সুখী জীবনের স্বপ্ন দেখছিলেন, তাই না? আপনি বলবেন- “সকলেই দেখে”। হ্যাঁ সকলেই দেখে, প্রেমাংশুও দেখত, মনে আছে? কবিতা লিখত, বলত সুপ্রিয়াকে নিয়ে নতুন সমাজে নতুন জীবনের স্বপ্নের কথা। তবুও ঝুঁকি নিয়ে প্রেসিডেন্সির রণজয়কে সেফ এসকর্ট দিতে গিয়েছিল, আর ফেরা হয়নি। বীভৎস, বিকৃত একটা লাশ হয়ে ভেসে গিয়েছিল সমীর আর কল্যাণের মত। খোকন বেঁচে ছিল, বেঁচে গিয়েছিল। অবশ্য আপনি সেটা জেনেছেন অনেক বছর পর, কাঞ্চন বলেছিল। খোকনের সহপাঠী ও কমরেড কাঞ্চন, পরে কলকাতায় চলে আসে। কাঞ্চন অবশ্য আপনার মত নিরপেক্ষ হয়ে যায়নি, সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতাই করেছিল, ধরিয়ে দিয়েছিল দশ থেকে বারো জন যোদ্ধাকে, প্রকাশ করে দিয়েছিল দুটো গোপন ঘাঁটি। এখন টিভি প্রোডিউসার, সাহিত্য আন্দোলন-টন করে। একদিন হঠাৎ কফিহাউসে দেখা হয়ে গিয়েছিল, ওই আপনাকে নিয়ে গিয়েছিল এসপ্ল্যানেড চত্বরে, একটা পা হাঁটু অবধি, একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেছে- খোকন, বাচ্চাদের জামাকাপড় বিক্রি করে ফুটপাথে। ইতিহাসে এম.এ., সম্পন্ন ঘরের ছেলে খোকন, সমাজ বদলাতে গিয়েছিল। সমাজ বদলেছে, সে বদল খোকন মানতে পারেনি, নিজেকেও বদলে নিতে পারেনি আপনার মত। খোকন চিরকালই এরকম বোকা, কল্পনাপ্রবণ, আবেগপ্রবণ। কাঞ্চন গিয়ে দাঁত বার করে বলেছিল, “কি রে কেমন আছিস, পিকিং রেডিও কি বলছে এখন?”। খোকন কিছু বলেনি, জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকায়নি একটা চোখে। একদলা থুতু ফেলে চোখ বন্ধ করেছিল। কাঞ্চনের মুখটা দপ করে নিভে গিয়েছিল; মিনমিন করে বলেছিল, “তখনই বলেছিলাম, হঠকারিতায় কিছু হয় না…”। আপনারা না যাওয়া পর্যন্ত চোখ খোলেনি খোকন। আপনি পালিয়ে এসেছিলেন মনোতোষবাবু, জিজ্ঞেস পর্যন্ত করেননি রাইফেলগুলো পাওয়া গিয়েছিল কিনা, তাই না? কিন্তু সত্যি কথা বলুন তো, আপনি নিশ্চিন্ত হতে চেয়েছিলেন কিনা, যে রাইফেলগুলো খোকনদের হাতে পৌঁছয়নি? আপনার আশঙ্কা ছিল, রাইফেলগুলো খোকনদের হাতে পড়লে, তারা যদি সব কৃষক-শ্রমিকদের নিয়ে দাঁড়ায়, রাইফেলের নলগুলো আপনাদের দিকেই তাক করে। কি হত তখন? কি হত?

        কি হল, গলা শুকিয়ে আসছে? জল খাবেন, কে দেবে জল? ভিজিটিং আওয়ার্স, নার্স ধারে কাছে নেই, প্রীতির আসার কথা, আসেনি। হয়ত মেয়েকে নিয়ে শপিংয়ে গেছে। সামনেই মেয়ে রেখার এনগেজমেন্ট। খুব সখ করে নাম রেখেছিলেন না- সুবর্ণরেখা? নামটা থাকেনি। আপনার কোন কিছুই থাকেনি মনোতোষবাবু, ভেবে দেখুন- কোন কিছুই আপনার রুচি, ইচ্ছা অনুযায়ী হয়নি। আপনি সবই মেনে নিয়েছেন; আপোষ যে আপনার মজ্জাগত মনোতোষবাবু। আপনি সুখী জীবনের স্বপ্ন দেখতেন না? দেখুন, যা যা যেভাবে চেয়েছিলেন, সেভাবেই হয়েছে, কিন্তু কোথাও কোন হিসাব মেলেনি। সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ভাবতে চেয়েছিলেন, বিচ্ছিন্ন হতে হতে একেবারে একা হয়ে পড়ে আছেন নার্সিংহোমের এই ছোট্ট কুঠুরিটায়। অথচ এরকম হওয়ার কথা ছিল না, না? আপনার কষ্ট হচ্ছে? অসহায় মনে হচ্ছে? মনে হচ্ছে না, এভাবে কোন এক ছোট্ট নার্সিংহোমের, ছোট্ট একটা ঘরেই যদি মরতে হয়, এত অপ্রাপ্তির হিসাব নিয়ে, কি অর্থহীন এই মৃত্যু? আর কি মনে হচ্ছে? অনুশোচনা?

        একি ! আপনি উঠে দাঁড়াচ্ছেন কেন? আপনার দমবন্ধ হয়ে আসছে? কি বললেন, সরোজ? সরোজ কোথা থেকে আসবে? গুলি? সেই গুলিটা আপনার হৃৎপিণ্ডে এসে বিঁধেছে, রাধানাথবাবুর কপালে যেটা ছিল? যন্ত্রণা হচ্ছে, বারুদের গন্ধে দম আটকে আসছে? আপনি উঠে দাঁড়াতে চাইছেন কিন্তু পারছেন না? স্যালাইনের নলটা খুলে গেল টান পড়ে; খুলে যাক, আপনাকে যে দাঁড়াতেই হবে মনোতোষবাবু, পৌঁছতেই হবে জানালাটার কাছে। আপনার যে চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসছে। কোনরকমে জানলায় পৌঁছে, কাঁপা কাঁপা হাতে গ্রিলটা ধরে দাঁড়িয়ে, কি দেখছেন মনোতোষবাবু? দেখুন, কাকটা উড়ে চলে গেছে, নিচে কয়েকটা কুকুর খাবার নিয়ে কামড়াকামড়ি করছে ঠিক মানুষের মত। কিন্তু; কিন্তু ওটা কি? ওই যে কৃষ্ণচূড়া গাছটা পেরিয়ে, ফুলের টব সাজানো বাড়ির ছাদ পেরিয়ে, টিনের কারশেডটার গায়ে লাগানো? লাল ঝাণ্ডা? হ্যাঁ ঠিক, লাল ঝাণ্ডাই বটে। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে একটু ছিঁড়ে গেছে, কোন দলের, কোন উপদলের চিহ্ন ছিল ওটার উপর, সব ধুয়ে গেছে। এখন শুধু বিশুদ্ধ লাল একটা পতাকা, সগর্বে উড়ছে নীল আকাশের বুকে। কি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে না পতাকাটাকে? দেখুন, পতাকাটার পিছনে আকাশে আবছা সাদায় সারি সারি মুখ- সরোজ, সমীর, কল্যাণ, খোকন, মিহিরদা আরও কত নাম না জানা মুখ… ওই তো, ওই তো চে! ওই তো লেনিন! কমরেড লেনিন! কি ভাবছেন মনোতোষবাবু, ওই মুখগুলোর ভিড়ে মিশে যেতে পারলে এই অর্থহীন মৃত্যু দেখতে হত না?

        একি! আপনি পড়ে যাচ্ছেন যে মনোতোষবাবু! মনোতোষবাবু! আপনি শুনতে পাচ্ছেন না? কি হয়েছে আপনার, দেখতে পাচ্ছেন না কিছু? সমস্ত আলো নিভে গেল চোখের সামনে থেকে? তবে; তবে কি আপনিও? নিত্যদিন হাজার হাজার মানুষ যেভাবে যায়, সেভাবে; সেভাবে কি আপনিও নিঃশব্দে মুছে গেলেন সময়ের পাতা থেকে?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s