খোকন

[বিধিসম্মত সতর্কীকরণঃ অশিষ্ট ভাষা ব্যবহৃত, ক্ষেত্রবিশেষে অপ্রাপ্তবয়স্কের অনুপযুক্ত।]

        দেবু থেবড়ে বসেছিল ঘাসের উপরেই, খালের দিকে পিছন ফিরে। সামনে খবরের কাগজের উপর ছড়ানো চানাচুর-বাদাম, চারকোণে চারটে স্টোনচিপস দিয়ে চাপা দেওয়া। প্লাস্টিকের গ্লাসগুলো উড়ে যাবে বলে একটু একটু জল ঢেলে রাখছিল। রঞ্জন বসেছিল খালের দিকে মুখ করে, পা ছড়িয়ে; হাতে কয়েকটা হ্যান্ডবিল- জ্যোতিষার্ণব চক্রবর্তী, সোনার গয়নার মজুরিতে ২০% ছাড়, নিশ্চিত সরকারি চাকরি, চুলকানির মলম, নানা রঙের, নানা সাইজের। আর একটা ইউজ অ্যান্ড থ্রো পেন, অনেকগুলো গাডার বাঁধা। রঞ্জন কবি, হ্যান্ডবিলের পিছনে ফাঁকা জায়গাগুলোয় লিখে রাখে যখন যেটা মাথায় আসে। যদিও, এখন নোংরা খালের জলে সূর্যটাকে ডুবে যেতে দেখতে দেখতে ওর কোন লাইনই মাথায় আসছিল না। খোকনকে পাঠানো হয়েছিল বিড়ি আনতে। অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ায় দেবু সবে খিস্তি দিতে যাবে, একগাল হেসে এসে পড়ল। খোকন কখনও রাগে না, কেউ কাঠি করলেও না, খিস্তি দিলেও না।

        আপনারা যারা জানেন না, তাদের জন্যই বলা যাক, খোকন আসলে খুব ভালো ছেলে। একটুখানি পাগলাটেও। লোকে বলে ওটা বংশগত, বাবারও ছিল, মাঝবয়সে কাজকর্ম ছেড়ে গেরুয়া ফতুয়া-ধুতি পড়ে কোথায় যেন চলে গেছিল। লোকে বলে, হরিদ্বার; হবে হয়ত। তারপর খোকনের মা রান্নার কাজ নিল, খোকনও কলেজ ছেড়ে এক ইলেকট্রিক মিস্ত্রির শাগরেদ হয়ে গেল। এতদিনে বেশ কাজ শিখেছে, কিছু কিছু ছোটখাটো জিনিস একাই করে আসে। মন্টুদা ভালোবাসে খোকনকে, মাঝেমধ্যে খিস্তিও দেয়। খোকন হাসে, রাগ করে না। সেজন্যই বোধহয় সবাই একটু ভালোবাসে খোকনকে; বলে, খোকন আসলে বোকা। খুব একটা অসুবিধা নেই তাতে, খোকন চালাক হতে চায় না। খোকনের মা আছে, ঠাকুর আছে, খোকনকে দেখে। মন্টুদা আছে, আপাতত খাওয়ার চিন্তা নেই। সন্ধেয় যেদিন ঘরে ফেরে, মা বলে “খোকন এলি? হাত-মুখ ধুয়ে ফেল বাছা; আজ কোন বিপদ হয়নি তো?” কোনদিন ঘাড় নাড়ে, কোনদিন বলে- “ও এট্টুখানি”।
– কি করলি বাছা তখন?
– ঠাকুরকে ডাকলাম।
এজন্যই খোকনের কোন অসুবিধা হয় না। দেবুও খোকনের উপর রাগ করতে পারে না। সবার আগে গ্লাসটা খোকনকেই এগিয়ে দেয়। তারপর রঞ্জনকে ডাকে। একটু পাশেই শ্মশানঘাট, হরিধ্বনি শোনা যায়। রঞ্জন আপনমনে বলে ওঠে- “যেতে পারি, কিন্তু কেন যাব”। দেবু নাক দিয়ে ফোঁৎ করে একটা আওয়াজ করে নিজের গ্লাসে মন দেয়। খোকন অল্প অল্প করে চুমুক দেয়। ও বেশি খাবে না, হয়ত এটাই শেষ। এরপর দেবু আর রঞ্জন সবটা শেষ করবে। তারপর হয়ত তর্ক করবে- ফুটবল, চাকরি, রাজনীতি- এলোমেলো। অথবা, উপুড় হয়ে শুয়ে থাকবে ঘাসে। কিংবা রঞ্জন কবিতা আবৃত্তি করবে, উঠে দাঁড়িয়ে চড়া গলায়, কিংবা একদম খালের ধারে বসে জলে পা ডুবিয়ে নিজের মনে। এসময়টা খোকনের ভারি ভালো লাগে, খোকন সব কিছু বোঝে না, কিন্তু ভালোবাসে। রঞ্জনকে সেই রাজপুত্রদের মত মনে হয় যারা সোনার কাঠি- রূপোর কাঠির খোঁজ রাখত। ফরসা, ঢ্যাঙা, দাগ লাগা সাদা পাঞ্জাবি, বাবরি চুল, হাতে গাডার লাগানো পেন। এখনও মাঝে মাঝে ওইসব বইগুলো বার করে পড়ে খোকন, ‘ঠাকুমার ঝুলি’, ‘বত্রিশ সিংহাসন’। দিম্মা দিয়েছিল ছোটবেলায়। ভালো লাগে। একটু আলো মরে যাওয়ার পর যখন খালের দিক থেকে একটা নেশা ধরানো ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়া দিতে থাকে, পৃথিবীটাকে বড় সহজ মনে হয় খোকনের। এই তিনজন, কয়েকটা এঁটো গ্লাস, খবরের কাগজ, খালি বোতল, ঘাসের উপর শুকনো পাতা, বিড়ির প্যাকেট, সবাই খুব কাছের, এদের মধ্যে কেমন যেন একটা নিশ্চিন্ত আরাম। এখানে মন খুলে সব কথা বলা যায়, ভেসে ভেসে যাওয়া সব কথা শোনা যায়, কিচ্ছু ভাবতে হয় না।

        খালি বোতলটা উপুড় করে জিভে ঠেকিয়ে রাখে দেবু। শেষ ফোঁটাটা ধীরে সুস্থে বোতলের গা বেয়ে নামে, গলায়, জিভে। তারপর বোতলটা ছুঁড়ে দেয় খালের দিকে, শ্যাওলা পড়া কতগুলো ইটের ফাঁকে আটকে থাকে।
– “যাঃ শালা, ভাগ! চুষে মেরে দিয়েছি, তোর আর দরকার নেই, ভাগ!”খোকন হাসে। দেবুও হাসে, “দুনিয়াটা হল কচি করে একটা হারামির হাট। হারামিপনার নিয়মই হল, যখন যাকে দরকার জাপটে তোলো ঘাড়ে, সব রস শুষে নিয়ে কিক্‌ মারো গাঁড়ে।”
– উরি শালা! হেব্বি মিলিয়েছিস তো।
– আসলে কথাটা হল- কেউ কেউ কবি নয়, সকলেই কবি।
– এটা ঠিক, রসেবশের মোমেন্টে সব পাঁচুই দু চারটে ছন্দ মিলিয়ে ফেলে।
– ঘা খেলেও হয়, কিংবা বার খেয়ে গেলে।
– অনেকদিন কিন্তু রঞ্জনের কাছ থেকে কিছু শুনিনি ভাই, নতুন কিছু লিখলি? শোনা দু-একপিস…
– না না বাল, শুনব না। সেই গরিব বড়লোক প্যাঁদাপেঁদি আর পাঁয়তারা, বোর হয়ে গেছি শুনতে শুনতে।
– দেখো ভাই, এটাই বাস্তব, আর এটাই গোটা সিস্টেমের রিংটোন।
– এটা কিন্তু ঠিকই বলেছে ভাই দেবু।
– সেকথা বাঁড়া আমায় আর শেখাতে হবে না। আবাল নই, সবই দেখতে পাই। পুলিশ, নেতা, আমলা যে যেখান থেকে পারছে মেরে দিয়ে চলে যাচ্ছে, বাজারখোলার খানকি হয়ে গেছি পুরো।
– যে যেখানে ঠেকাচ্ছে, লুটে নিচ্ছে। ছোট-বড়-মাঝারি, দুহাতে তুলে হাঁয়ে ভরছে, গিলতে পারছে না, নালে-ঝোলে, তবু হাত বাড়াচ্ছে। বড়লোকের জন্য আইন আছে, পুলিশ আছে, সব আছে। গরিবের জন্য কে আছে, গরিব ছাড়া?
– নেতাজী যদি তখন ফিরে আসত রে; এরকম হতেই পারত না। ওই যে বাঁড়া গান্ধী আর রামমোহন, ওই গান্ডুগুলোর জন্যই এই দশা আজ, তখনই মেরে খাল করে রেখে দিয়েছে।
– রামমোহন?
– আরে না না, রামমোহন না। ওই যে টুপি পরা, কোট… নেহেরু। মেনিমুখো ঢ্যামনা।
– গোরাসাহেব গেল কালাসাহেব এল। তিলে খচ্চরদের হাতে তুলে দিল দেশটাকে।
– দেখতিস তখন নেতাজী থাকলে, টাইট দিয়ে ছেড়ে দিত সব। ভারত; ভারত দেখতিস কোথায় চলে যেত। মাথা তুলে বাঁচত সব লোকে।
– বাল
– মানে?
– বাল হত।
– দেখ রঞ্জন, প্রেসিডেন্সিতে পড়েছিস, বিশাল জ্ঞানী, বহুত আচ্ছা, অনেক হুমদো হুমদো লোকের কথা জানিস, অনেক জ্ঞানমারানো বই পড়িস, সেও ভি আচ্ছা; সেসব নিয়ে তোর ওই আঁতেলদের ম্যাগাজিনে লিখবি, কোই বাত নেহি। যেখানে যাই করিস, তিনজনের নামে কখনও পেঁয়াজি করবি না- নেতাজী, সচিন তেন্ডুলকার আর অমিতাভ বচ্চন, কেস খুব বিলা হয়ে যাবে।
তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ। খোকনই নিরবতা ভাঙে- “হ্যাঁ ভাই, বচ্চনের কথাটা বললি ভাই, এই একটা লোক মাইরি কোন কথা হবে না। শোলে-টোলে দেখার পর এমনি এখনকার ছবি দেখবি, লাগে না।”
– এখন! শালা ওগুলো সিনেমা? যার গুষ্টিতে কেউ কখনও সিনেমা দেখেনি, সেও দেখ ক্যামেরা নিয়ে মদ্দা-মাগির পাল নিয়ে দৌড়চ্ছে। এই সেদিন মুন্নাদার গ্যারেজে দেখছিলাম, কি একটা বালের কেত্তন, ঢুকছি যখন শেষ সিন চলছে। সে কি রগড়; একটা পুলিশ হেভি রুস্তমবাজি করছিল, গরম গরম ডায়লগ দিচ্ছিল, হঠাৎ দানা খেয়ে কেলিয়ে গেছে, অমনি কোত্থেকে ফুল ফ্যামিলিতে যত মেয়ে ছিল, ছানাপোনা নিয়ে হাজির। সবাই মিলে হাউমাউ করে, আর বলে- “আমার ছেলে বড় হয়ে তোর মত পুলিশ হবে”। হুঁ! মুখে মুতে দিই শালাদের! পুলিশ হবে! দুনিয়ায় এত ভদ্র পেশা থাকতে পুলিশ হবে! বেঁড়ে হারামি খচ্চরের দল!”
– সত্যি ভাই, এখন কোন ক্যাচাল হবে, পেটোবাজি হবে, বডি পড়ে যাবে, তবু কেউ পুলিশ ডাকবে না। তারাদা ভালো বলে, ‘পুলিশ ডেকে আনা’ মানেই ‘বিপদ ডেকে আনা’।
“পুলিশ ওরে পুলিশ, কবির কাছে আসার আগে টুপিটা তোর খুলিস।” রঞ্জন এতক্ষণ পেছন ঘুরে বসেছিল, বিড়িটা ফেলে দিয়ে এদের দিকে ঘুরল। দেবু একটা কিছু শোনার আশায় কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল রঞ্জনের দিকে, তারপর বলতে শুরু করল- “সেদিন পঞ্চা রিকশাটা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে সাইডে গিয়ে মুতছিল, সিট তুলে নিয়ে চলে গেছে, শেষে থানায় গিয়ে চারশো টাকায় রফা হল। আর কোন কাজে লাগুক না লাগুক, গরিবের গাঁড় মারতে দৌড়ে দৌড়ে আসবে। এদিকে বসাকদের গাড়ি গেলে তো স্যালুট মারে। লাগতে যা না বড়লোকদের পোঁদে, ওই টুপি দিয়ে পোঁদ মুছে ফেলে দেবে।” “এই পুলিশ মিলিটারি সবসময়ই রুলিং পার্টির পৈতৃক সম্পত্তি। আর, রুলিং পার্টি হচ্ছে বড়লোকরা, সে যখন যে নামেই থাকুক। যে বড়লোক হবে সেই গদিতে যাবে, যে গদিতে যাবে সেই বড়লোক হবে, মাঝখান থেকে ভুক্কাড় আদমি সব ধুঁকতে ধুঁকতে মরে যাবে।”‍‍‌‍‍‌ রঞ্জন আবার বিড়ির প্যাকেটের দিকে হাত বাড়াল। এসব কথার মাঝখানেই এগরোল আসে দৌড়ে দৌড়ে, ওদেরকে পেরিয়ে পাঁচিল টপকে জংলাবাগানে চলে যায়। বোঝা যায়, পুলিশ আসছে। দেবু উঠে পড়ে প্যান্ট ঝাড়ে, দেখাদেখি খোকনও উঠে দাঁড়ায়। রঞ্জন চোখ বুজে বিড়ি টানতে থাকে। দেবু খেঁকিয়ে ওঠে- “আর ধ্যান মারাতে হবে না, উঠে পড়ো। এখুনি হারামিগুলো আসবে, জংলাবাগান, শ্মশানঘাট রেড দিয়ে কিছু পাবে না, তখন এসে ভদ্রলোকের অ্যাঁড় ধরে টানাটানি।”

        এমনি করেই দিনগুলো চলে যায়- তাড়া খেয়ে, ঠোকা খেয়ে, ঘষড়ে ঘষড়ে। কেউ হাঁপিয়ে ওঠে, আকাশের দিকে মুখ তুলে খিস্তি দেয়, আবার ঘাড় গুঁজে দৌড়তে থাকে। এরই মাঝে খালের ধার থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া আসে, জীবনগুলো হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। কেউ কেউ হাসে, এমনিই হাসে। সকালে চায়ের দোকানে খোকন দেখতে পায় এগরোলকে। খোকন হাসে, চা-লেড়ো বিস্কুট খাওয়ায়। এগরোল হাসে। এগরোলের খালি গা, প্যান্টের পেছনে ক্রিকেট বলের সাইজের ছেঁড়া। মা-বাবা আছে। তারা কে, কোথায় আছে কেউ জানে না; টেবিলক্লথে মুড়িয়ে ঘোষডাক্তারের ডিসপেনসারির সামনে রেখে গিয়েছিল। কম্পাউন্ডার নিতাইয়ের হাত দিয়ে ডাক্তারবাবু একটা অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, পালিয়ে এসেছে। টেবিলক্লথের কেসটা থেকেই বোধহয় নাম হয়েছিল এগরোল। এখন বাজারের লোকেদের কাজ করে টুকটাক, তেরপল পেতে দেওয়া, বঁটি লাগানো, পাল্লা বাটখারা গুছিয়ে রাখা, পাঁচ-দশ করে যা হয়, দুপুরে খাওয়াটা হয়ে যায়। রাত্রে পার্টি অফিসের বারান্দায় বসে থাকে, শোয়। টুকটাক ফাইফরমাশ খাটে, খাবার জুটে যায়, মাঝে মাঝে পানীয়ও। ছোটখাটো চুরিচামারিও করে, ঘড়িটা রেডিওটা। এখন অনেকেই কায়দা করে পাঁচিলে কাঁচ বসায়, শিক বসায়, এগরোল তাদের ঘাড়ে হাগে। তিনফুটের শরীরটা ঘুরে ঘুরে বেড়ায় সবজায়গায়, এটা কুড়োয়, ওটা ভাঙে, হাসে। অকেশনে প্রচুর হল্লা করে, অনেক রাত অবধি নাচে। নাচতে নাচতে নীল-হলুদ আলোগুলো অনেকগুলো করে টুকরো হয়ে যায়, ঝাপসা হয়ে আসে, তখন আর সকালের কথা মনে পড়ে না।

        এরকম আসে এক একটা রাত, হলদে হ্যালোজেনের জ্যোৎস্নাও মায়াবী হয়ে ওঠে, সব হিসাব গোলমাল হয়ে যায়। ইচ্ছেগুলো ডানা মেলতে থাকে, জিন, পরী, অ্যাঞ্জেল, মিঠুন, অমিতাভ সব যেন বাস্তবের সঙ্গে মিশে যেতে থাকে। বসাকদের বাগানের পাঁচিলের গায়ে ইট পেতে বসে থাকে রঞ্জন, দেবু। খোকনের দেরি হয়ে যায়। দেবুর পলিথিনে মোড়ানো আইস কিউব গলে যায়। খোকন এত রাতে বাইরে থাকে না, কিন্তু আজ স্পেশাল। দেবু কোত্থেকে একটা স্কচ হুইস্কির বোতল জোগাড় করেছে; খোকন খাবে না বটে, থাকতে তো হয়ই। তাছাড়া, বোতলটা ওর জিম্মায় ছিল, দেবু দিয়ে গেছিল, বাটপাড়ি হওয়ার ভয়ে। ও পৌঁছতেই দেবু গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে, “শুয়োরের বাচ্চাটা সব মাটি করে দিল, সব আইস কিউব গলে গেল শালা। ঝপাঝপ ঢাল, ঝপাঝপ ঢাল!” এক পেগের পর সব শান্ত হয়ে যায়। এই বাগান লাগোয়া রাস্তাটায় দিনমানেই কেউ আসে না, শুধু বসাকদের গেস্ট এলে গাড়ি যায়, এক্সট্রা গ্যারেজ বাড়ির পেছনদিকে। দেবু ইঁট সরিয়ে রাস্তাতে বসে, পা ছড়িয়ে দেয়। খোকনকে বলে- “হ্যাঁ রে, কি মারাচ্ছিলি বাড়িতে? সকাল সকাল এসে পড়তে বললাম।”
-“মা ঘুমাল, দরজা দিয়ে এলাম।” দেবু কিছু বলল না, খোকনকে একটা গ্লাস এগিয়ে দিল। ফিরিয়ে দিতে গিয়েও ফেরানো হল না খোকনের। রঞ্জন বাগানের গেটের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলছিল- “Whose woods these are I think I know. His house is in the village though…” তারপর মুখ বেঁকিয়ে একটু হাসল। খোকন হঠাৎ একটু জড়ানো গলায় বলল- “জানিস ভাই, আসতে দেরি হয়ে গেল।”
– হুঁ
– মেন রাস্তা দিয়ে আসছি, এই দিকে বাঁক নেব মোড়টায়; পা বাড়িয়েছি, হঠাৎ…
– হঠাৎ?
– দাঁড়িয়ে গেলাম, ল্যাম্পপোস্টের গোড়ায়।
– কেন?
– ল্যাম্পপোস্টের উপর থেকে কথা… পাখির গলায়, একটা ছেলে, একটা মেয়ে…
– হুঁ।- বলল, রাজকন্যা বন্দি… রাজপুত্র আসছে। মেয়েটা বলল “কোথায়”? বলল… “রাস্তায়”…
– আর?
– ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী!
– আর কি বলল?
– আর জানিনা।
– ঢ্যামনামো হচ্ছে? দেড় ঘণ্টা ধরে ইট পেতে বসে আছি, সব বরফ গলে জল হয়ে গেল, উনি এসে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী মারাচ্ছেন!
কোথা থেকে একটা পাখি উড়ে গেল। পেঁচাই হবে। একটা বড় কালো এসএউভি হুস করে বেরিয়ে গেল। মাটির কাঁপনে খালি বোতলটা পড়ে গেল। দেবু খিস্তি দিয়ে উঠল। একটা নেড়ি কুকুর ভৌ ভৌ করে চেঁচাল দুবার। রঞ্জন পকেট থেকে একটা তোবড়ানো সিগারেট বের করে সোজা করতে করতে বলল, “কে গেল বলত?”
– কোন নেতা-ফেতা হবে। ঢ্যামনা শালা!
– গাড়িটা দেখেছিস?
– গরিবের টাকা পোঁদ মেরে হচ্ছে সব, বাড়িটা দেখেছিস, ঢুকেছিস কখনো ভেতরে?
– না, তুই গেছিস?
– হ্যাঁ, বাবার সঙ্গে, বাড়ির ট্যাক্স নিয়ে কি একটা লাফড়া হয়েছিল, কাউন্সিলরের সই লাগবে বলেছিল।
– করে দিল?
– না, খেদিয়ে দিল। বলল, পার্টি অফিসে যেতে। পয়সার কি চিকনা ভাই, কার্পেট মারানো ঘর, দেওয়ালে মার্বেল, দুটো বড় বড় কুত্তা জিভ বের করে হ্যা হ্যা করছে, বিশাল ফুলদানি, র‍্যাক ভর্তি বই।
– কি বই?
– জানিনা, সব এক সাইজের, বাদামি, বাঁধানো।
– ওগুলো ডামি বই।
– মানে?
– শুধু খোলগুলো থাকে, শক্ত করে বাঁধানো, ভেতরে ফাঁকা।
– যাঃ বাঁড়া! মানে কি হল তাহলে?
– লোকে দেখল, বই সাজানো, কালচার। তাছাড়া, ভেতরে কিছু রাখলিও ধর, নোট-টোট, চেম্বার-টেম্বার।
– চেম্বার রাখে? চালাতে পারে নাকি?
– পারবে না? ওয়াগন ব্রেকার ছিল তো। আগের জমানাতেও পার্টির সঙ্গে হাত ছিল, হেব্বি টানতো। তবে এখন আর নিজে হাতে চালাতে হয় না, লোক পোষে।
– এখন তো চেয়ারেই ঠেকিয়ে নিয়েছে, মস্তিতে লুটবে। পাবলিকের পোঁদ মেরে ফাঁক করবে আর ঘ্যামা ঘ্যামা গাড়ি কিনবে।
– পাবলিক তো তুইও, কিছু বলিস না।
– এক চড়ে সংসদ ফেলে দিতে পারি জানিস?
– ফেলিস না কেন?
– ল্যাদ লাগে।
রঞ্জন চোখ বুজে দেওয়ালে হেলান দিল। দেবু খুব মজা পেল, বেসুরো গেয়ে উঠল ” ন্যায়নো মে সপনা, সপনা মে সজনা…”। খোকন হাসল, সাইডে থুতু ফেলল একবার। “একদিন সব শালা ঝেঁটিয়ে বিদায় হবে, ওই লোকগুলো আসবে… ওই যে… রঞ্জন বলে, আবার আসবে… সব পুঁটকিজাম হয়ে যাবে।” এবার দেবু হাসে, জামার বোতামগুলো খুলে ফেলে, বলে “রঞ্জন, কে একটা ওই যে লিখেছিল না- ‘ব্ল্যাকে মাল খেলে হলুদ হ্যালোজেনের জোনে যেও না।’…”
– নবারুণ, নবারুণ ভট্টাচার্য।
– কথাটা একঘর বলেছিল। মালটা আছে না গেছে?
– গেছে।
– সব ভালো ভালো লোকগুলো টপকে যায়।
একটা হাওয়া এসে ওদের কাছ থেকে বিড়ির প্যাকেট, মশলার পাতা, কাগজের টুকরোগুলো আলগোছে নিয়ে যায়। ঠাণ্ডা, জমাট রাত নামতে থাকে। পুরো স্ক্রিন আস্তে আস্তে ব্ল্যাক হয়ে যেতে থাকে। যাই হোক, অন্ধকারের ঠেকদারেরা হলুদ হ্যালোজেনের জোনে আসে না। সেদিন রাত্রে বাড়ি ফেরার সময়, খোকন আগে আগে উঠে আসে। সেই ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে শোনার চেষ্টা করে, কিছু শোনা যায় না। হঠাৎ সামনে দেখে বিপিনের বোন, বাড়ি ফিরছিল, আটকে পড়েছে। অন্যদিন গাড়ি একেবারে বাড়ির সামনে নামিয়ে দেয়, আজ ড্রাইভার আসেনি। চাঙ্গু আর ওর দলবল ঘিরে ধরেছে, নাচছে, রগড় করছে। এবার আবার সেই গলাটা শুনতে পায় খোকন, এগিয়ে যায়। চাঙ্গুর দলবল এবার ওকে নিয়ে পড়ে। একটা লোহার পাইপ নিয়ে এগিয়ে আসে ব্যাটারি। খোকন চেঁচায়। কাছেই পার্টি অফিস, এগরোল শুয়ে ছিল, ছুটে চলে যায়। লোক আসে, তেলেপাড়া বস্তি থেকে। দেবু, রঞ্জনও আসে। খোকনকে মাটিতে ফেলে রেখেই চাঙ্গু পালায়, দলবলও। ব্যাটারি পালাতে গিয়েও ধরা পড়ে যায়। অনেকদিনের খার, তেলেপাড়া বস্তি ঝাঁপিয়ে পড়ে। হাতেনাতে ধরা, বসাকের বাবাও বাঁচাবে না।

         ভোট আসে, চাঙ্গুর রেলা বাড়ে। খোকনের কাজ বাড়ে, মাইক লাগাতে হয়। এগরোল পোস্টার মারে, দুটো পোস্টার এক টাকা। ভোটের দিন বাওয়াল হয়, পেটো চার্জ হয়, ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পর পুলিশ ঘুরে চলে যায়। বেলা গড়াতে ঝামেলাও গড়ায় আরও কিছুদুর। তেলেপাড়া বস্তির লোকজন ভোট দিতে গিয়ে শোনে তাদের ভোট হয়ে গেছে, একটা হুজ্জুতি লাগার উপক্রম হয়। একটা চাপা রাগ ফুঁসতে থাকে গরম হাওয়ায়। এইসময়ই খবর আসে রথীন মাস্টার মার খেয়েছে, হাসপাতালে নিয়ে গেছে পার্টির ছেলেরা, অবস্থা আশঙ্কাজনক। প্রিয় মাস্টারবাবুর মার খাওয়ার খবরে যেন কেরোসিন পড়ে আগুনে। চাঙ্গু মার খেয়ে যায় রোডের উপর। এরপর হুজ্জুতিটা শুরুই হয়ে যায়। প্রচুর অচেনা লোক আসে। বাইক, টাটা সুমো। বস্তির ভেতর ঢুকে যায় হুড়হুড় করে। চেন-শাবল-বাঁশ, যুদ্ধের দাপটে ঘর-গেরস্থালি গুঁড়িয়ে যায়, মাটিতে লুটোয় থালা, বাসন, বিছানা, ইজ্জৎ। কাদা মেখে দুমড়ে মুচড়ে পড়ে থাকে বিনামুল্যে বিতরিত বই-খাতা, বাবার ফটো। আবার পুলিশ আসে, লাঠিচার্জ হয়। যে কটা থালা-বাসন, আসবাব বেঁচেছিল, এ দফায় তারাও ভেঙেচুরে পড়ে থাকে। পড়ে থাকে মানুষও, মাথা ফাটা, হাত-পা থেঁতলানো কিংবা মাজায় চোট; যারা ভালো থাকে তাদের পুলিশ নিয়ে যায়। একটু ঠাণ্ডা হয়েছে দেখে খোকন বেরোয়, মার প্রেশারের ওষুধ ফুরিয়েছে। টিনের দরজার শব্দে মা সাড়া দেয়- “ও খোকন, কই যাস বাপ?”
– দেখি, ওষুধটা নিয়েই আসি, বৃহস্পতিবার, ওবেলা যদি না খোলে…
– কোন ঝামেলায় জড়াস না বাপ আমার। যা দিনকাল…
জুতোটা পড়ে এক পা এগোতেই মনে হয় মোবাইলটা নেওয়া হয়নি। “মা, টেবিল থেকে মোবাইলটা দিয়ে যাও না”। মা মোবাইল নিয়ে আসে, বলে “ও খোকন”
– কি?
– একটা পাতিলেবু পেলে নিয়ে আসিস না, আজ শুধু ডাল, কোন তরকারি নেই রে।
– এখন পাতিলেবু কোথায় পাব, একে ভোটের দিন, তাও এত বেলায়…
– পাবি না? ছেড়ে দে তাহলে, পেঁয়াজ-লঙ্কা তো আছে।
– আচ্ছা, দেখব পেলে…
বাজার এলাকা পুরো শুনশান। লেবু দূরে থাক, কোন একটা লোক নেই বাজারে। কেমন একটা থমথমে পরিবেশ। খোকন ভাবে তাড়াতাড়ি ওষুধটা নিয়ে বাড়ি যাই, গতিক সুবিধার নয়। আদ্ধেক ঝাঁপ ফেলা ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, একটা গুলি এসে লাগে। সব আলো নিভে যায়। খোকন মাকে ডাকে, ঠাকুরকে ডাকে, কেউ সাড়া দেয় না। একটা হলুদ আলো গোল হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। খোকন জলের জন্য হাত বাড়ায়। কেউ আসে না জল দিতে, শূন্য হাত চিত হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে। হলুদ হ্যালোজেন নিভে আসতে থাকে, স্ক্রিন কালো হয়ে যায়।

        এক বিকেলে, দেবু আর রঞ্জনকে আবার দেখা যায় খালপাড়ে। ততদিনে খোকনকে নিয়ে সব দলের মিছিল হয়ে গেছে, জংলাবাগান থেকে এগরোলের লাশও পাওয়া গেছে। তেলেপাড়া বস্তির তছনছ হয়ে যাওয়া সংসার গুলো আবার আস্তে আস্তে দানা বাঁধছে। নতুন হাঁড়ি-কড়াই আসছে দুটো একটা করে, ফিরছে পুরনো মানুষ। দেবু যায়নি খোকনদের বাড়ি, রঞ্জন গিয়েছিল। দেবুর ভয় করে, বুড়ি হয়ত এখনও দোরগোড়ায় বসে আছে ওষুধ নিয়ে ছেলে ফিরবে বলে। বুড়িদের কান্না একদম দেখতে পারে না দেবু। গলা শুকিয়ে আসে, বিনবিন করে ঘাম হয়। দেবুর এমনিতে কষ্ট-ফস্ট, কান্নাকাটি এসবের বালাই নেই; তবে কিছু কিছু ব্যাপার থাকে, সকলেই ছড়িয়ে ফেলে ।

        একগোছা হ্যান্ডবিল ছিঁড়ে ছিঁড়ে জড়ো করেছে রঞ্জন, আগুন জ্বালায়। একটা একটা করে দেশলাই আগুনের মধ্যে দেয় আর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আগুনের দিকে। ছোট্ট একটা আগুন রঞ্জনের চোখে ডুবন্ত সূর্যকে ম্লান করে দেয়। হঠাৎ বলে ওঠে, “সব জ্বলে যাবে। ছারখার হয়ে যাবে সব। তেলেপাড়া বস্তি, নিমতলা, ডোমপট্টি সব জ্বলছে। যেকোনো মুহূর্তে ঝড় উঠবে। ছারখার হয়ে যাবে সব।” প্রত্যেকটা আগুনই ছাইচাপা পড়ে একেবারে নিভে যাওয়ার আগে পর্যন্ত বুকে করে একটা বিশাল সম্ভবনা বহন করে। সেই সম্ভাবনার আভাস রঞ্জনকে উত্তেজিত করে। যে কারণেই আগুন জ্বলুক, জ্বলে ওঠার পর তার কাছে ক্রোধ, শোক, আকাঙ্খা বা প্রতিশোধস্পৃহার কোন পার্থক্য থাকে না।

        আগুন দেখে বিড়ি খাওয়ার ইচ্ছা হয় দেবুর। বিড়ি আনতে পাঠাবার কাউকে না পেয়ে খুব অসহায় লাগে। আকাশের দিকে মুখ করে অস্ফুটে একটা খিস্তি দেয়, পকেট থেকে খালি বিড়ির প্যাকেটটা বের করে রঞ্জনের আগুনে দেয়। তারপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে। রঞ্জন মৃদু গলায়, প্রায় বিড়বিড় করে বলে চলে– “আরো ঢের ব্যর্থ অন্ধকারে/ যারা ফুটপাত ধ’রে অথবা ট্রামের লাইন মাড়িয়ে চলছে/ তাদের আকাশ কোন্ দিকে?” যখন খুব মন খারাপ লাগে, বা নিজের চারপাশের পৃথিবীটাকে একেবারে জনহীন অরণ্য মনে হয় তখন জীবনানন্দ বড় বেশি আপন হয়ে ওঠেন রঞ্জনের। হঠাৎ দেবু ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, ঘাসে মুখ গুঁজে যেগুলো বলে সেগুলো অনেকটা ক্লাস ফোরের সরস্বতী পুজোর প্রার্থনার মত শোনায়, “কোন দিন কোন খাম কাজ করেনি, মুখ ফুটে কাউকে খিস্তি দেয়নি, লোকের ভালো করেছে চাই মন্দ করেনি তাকেই তোমার গুলি করতে মন হল ভগবান? ঘরে বুড়ি মা একা ভাত রেঁধে বসে রইল, দুগ্গাচাতালের লাইনের কাজ পড়ে রইল, এখন খোকন না হলে কি করে হবে? এবার পালে-পরবে বস্তির ভেতর লাইটিং কে করবে, নতুন ঘর বসলে কে বিনিপয়সায় লাইন টেনে দেবে?… আর কখনও খিস্তি দেব না, মাল খাব না, কারো কিচ্ছু সরাব না, কারও পোঁদে কাঠি করব না, তুমি খোকনকে হঠাৎ একদিন ফিরিয়ে দাও ঠাকুর.. বড় ভালো ছেলে ছিল গো..” দেবুর মুখে এত মোলায়েম কথা শুনে একটু চমকে যায় রঞ্জন; তারপর ওর পিঠে সান্ত্বনা দেওয়ার মত করে দুবার থাবড়ে দেয়। আস্তে আস্তে ঘুরে দেবু চিৎ হয়ে শোয় এবার, খানিকটা যেন আকাশের দিকেই বলে কথাগুলো– “বহুৎ খুশনসিব ছিলি, সাচ্চা আদমিও ছিলি তুই ভাই। নইলে এত লোক তো গেছে বাগানবাড়ির গলিতে, কেউ কখনও শুনেছে? দিদার কাছে ছোটবেলা শুনতাম, রাজপুত্রদের রাস্তা বাতলানোর জন্যই আসে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী। রাজপুত্র কি শুধু রাজার ঘরে হয়, দিল সে রাজপুত্রই ছিলি তুই। আমাদের মধ্যে তোকে মানাচ্ছিল না রে।”

[ কোন চরিত্রই একেবারে কাল্পনিক নয়; সেহেতু, কোন মতামতই একান্ত ব্যক্তিগত নয়। যে যে চরিত্র যা যা মন্তব্য করেছেন, তাদের দায় সম্পূর্ণ তাদের উপরেই বর্তাবে।]

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s