রাষ্ট্রশক্তি বনাম একটি সম্ভাবনা

দৃশ্য ১
         ক্লিক্‌ করে একটা শব্দ শুনে ধড়মড় করে উঠে বসল ক্রোম্যান। বালিশের নিচ থেকে ULGটা বের করে হাতে নিয়ে, বাঁ হাতে একটি বিশেষ মুদ্রা করে নাইটল্যাম্প জ্বালাল। একটা ছোট্ট মিনিবট, কালো, বড়সড় একটা গুবরে পোকার মত দেখতে, দরজার নিচের খানিকটা অংশ মাখনের মত কেটে ফেলেছে। একটা লেসার পয়েন্টার এদিক ওদিক নেচে ক্রোম্যানের উপর স্থির হল। জান্তব ক্ষিপ্রতায় খাট থেকে লাফিয়ে পড়ল ক্রোম্যান। পরমুহূর্তেই একটা ধাতব সংঘর্ষের আওয়াজ করে নাইটল্যাম্প নিভে গেল। অন্ধকার।

দৃশ্য ২
         কতগুলো বড় ময়লা ফেলার বিন, তার মাঝখান থেকে একটা সরু রাস্তা। একটু ভাঙাচোরা কংক্রিটের রাস্তা, যেরকমটা এখন আর বিশেষ দেখা যায় না। একটা বিনের আড়ালে বসে হাঁপাচ্ছে একজন মানুষ, গায়ে খয়েরি ধুসর জ্যাকেট, মাথায় হুড টানা। এধরনের জ্যাকেট আজ থেকে সত্তর-আশি বছর আগে খুব জনপ্রিয় ছিল। একটা খালি কোকের ক্যান গড়িয়ে পড়ার শব্দে হুডটানা জ্যাকেট চমকে ঘুরে তাকাতে, ক্রোম্যানের ঘেমে যাওয়া মুখটা দেখা গেল। সে মুখটা বার করে এদিক ওদিক দেখে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। কোথাও কেউ নেই, শুনশান রাস্তা; একটা দিক বড় রাস্তায় গিয়ে পড়েছে। সেদিক থেকে সামান্য শব্দ আসছে। একেবারে ধার ঘেঁসে উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করল ক্রোম্যান; একটু দ্রুতপায়ে, মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে তাকাতে। সামনে একটা বাঁক, রাস্তাটা ডানদিকে ঘুরছে। বাঁক ঘুরে ক্রোম্যান একটা রেস্টিং শেড দেখতে পেল। সামনেটা খোলা, এয়ার কন্ডিশনিং নেই। একসারি মাত্র চেয়ার, ধুলোর আস্তরণে ঢাকা। একদিকে একটা পানীয় জলের চেম্বার। একটু ইতস্তত করেও ভেতরে পা দিল ক্রোম্যান, চারিদিকে খুঁটিয়ে দেখল কোন ক্যামেরা আছে কিনা। নেই দেখে ধুলোভরা চেয়ারেই গা এলিয়ে দিল।
         বাইরের ধোঁয়াভরা আকাশ দেখতে দেখতে অনেক কিছুই ফ্লাশব্যাকে আসছিল- হাইল্যান্ডের জীবনযাত্রা, বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি, ভার্চুয়াল গেম গ্রাউন্ড; সব কিছুই খুব সহজ, উচ্ছ্বাসময় ছিল। খুব সুন্দরও ছিল সবকিছু- নিখুঁত, ছিমছাম। হাইল্যান্ডের আকাশে ধোঁয়া থাকে না, রাস্তায় ধুলোময়লাও থাকে না। তবুও গাড়ি করেই স্কুলে যেত ওরা। ওদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব গাড়ি ছিল, স্বয়ংচালিত। হাইল্যান্ডে কেউ রাস্তায় হাঁটে না, প্রত্যেকেই তিন বছর বয়স হবার সঙ্গে সঙ্গে একটি করে গাড়ির মালিক হয়। স্কুলেও প্রত্যেকের নিজস্ব কেবিন থাকত, কনফারেন্স হলে যাওয়ার আগে যেখানে বসত ওরা। সে এক আরামের দিন ছিল। সপ্তাহে একদিন স্কুল ছাড়া কোথাও যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। পড়া বাড়িতেই হত, যার যার নিজের মত সফটওয়্যারে, কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে। খেলা বলতে ওই ভার্চুয়াল গ্রাউন্ড। বন্ধুবান্ধবের ব্যাপার বিশেষ ছিল না। এদিক ওদিক কোন পার্টিতে টুকরো টাকরা যা আলাপ হত, তাই। হয়ত এভাবেই একা একা বিলাসে ডুবে কেটে যেত, সেই চ্যারিটি ট্রিপটাই সব গোলমাল করে দিল। প্রতিবছরের মতই গাইডের তত্ত্বাবধানে ওদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল একটা লোল্যান্ডে, সঙ্গে কিছু টাকাপয়সা, জামাকাপড়, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট অনুষ্ঠান করে সেখানকার লোকজনের হাতে তুলে দেওয়া হত সেইসব জিনিস। লোল্যান্ডের লোকজনের রকমসকম দেখে বেশ অবাকই হত ওরা- রাস্তায় হাঁটে, তাও আবার একসঙ্গে এতজন! রাস্তাঘাটও অত্যন্ত নোংরা, পা দিলেই ধুলো লাগে। যদিও ওদের যাওয়ার আগে এয়ারপোর্টের আশেপাশের রাস্তাঘাট, যেসব জায়গায় ওরা যেত, সেগুলো বিশেষভাবে পরিস্কার করা হত।
         সেদিন সকাল থেকে সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল- অনুষ্ঠান করে জামাকাপড় দেওয়া, টাকা দেওয়া, সবই নিয়মমাফিক হল। তবে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগে হঠাৎ রাস্তায় হাঁটতে শখ হল ক্রোম্যানের। হাঁটতে গিয়ে দলছুট হয়ে গেল, আর তখনই দেখা হল সেই অদ্ভুত লোকটার সাথে। ‘পিটইয়ার্ড’, মানে সেই লোল্যান্ডটায় আর কখনও ফিরে না গেলেও সেই সরু ধুলোভরা রাস্তা আর সেই ছোট রহস্যময় ঘরটা এখনও নিখুঁতভাবে মনে আছে ক্রোম্যানের। হাঁটতে হাঁটতে একটা নিচু ছোট ঘর থেকে একটা অদ্ভুত নীলচে-বেগুনি আলো বেরোতে দেখে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ও। শেষপর্যন্ত কৌতূহল সামলাতে না পেরে ঢুকেও পড়েছিল, আর দেখতে পেয়েছিল রহস্যময় লম্বা লোকটাকে, যে নিজের পরিচয় দিয়েছিল দ্য টিচার বলে। বিরাট কালো জামা, মাঝে মাঝে রেডিয়ামের মত উজ্জল বেগুনি রঙের ছোপ, আর মাথায় টুপি। সে যেন জানত ক্রোম্যান আসবে, তার অপেক্ষাতেই ছিল, ও ঢুকতেই উঠে এসে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপরের কথা ক্রোম্যানের ভাল মনে নেই- কিছু অদ্ভুত ছবি, আর শব্দ… সব ঘুরছিল। কয়েকটা কথা অস্পষ্টভাবে মনে আছে- “অসীম শক্তি… সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসবে না… অপেক্ষা… সঠিক মুহূর্তের জন্য…”। তারপর একটা তীব্র যন্ত্রণা আর সারা শরীরে জ্বালা- সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।
         ঘোর ভেঙ্গে উঠে দাঁড়াল ক্রোম্যান, অনেক্ষন বসা হয়ে গেছে। এবার আবার হাঁটতে শুরু করতে হবে। পানীয় জলের চেম্বারটার সামনে গিয়ে সুইচ টিপল, বেরিয়ে আসা গ্লাসটায় জল ভরল, তারপর একনিঃশ্বাসে খালি করে গ্লাসটা প্যানেলের গর্তটার মধ্যে ফেলে দিল। তখনই চোখে পড়ল, কলের পাশে ছোট্ট একটা ক্যামেরা, সাধারনভাবে চোখে পড়বে না। তীব্র উত্তেজনায় পকেট থেকে ছুরি বার করে নষ্ট করে দিল ক্যামেরাটা, তারপর রুদ্ধশ্বাসে ঘুরে দাঁড়াল রাস্তার দিকে। ছুটে বেরোতে গিয়েও দাঁড়িয়ে গেল, অনেক দেরি হয়ে গেছে। ঠিক দরজার সামনে মাটি থেকে দশ-বারো ফুট উপরে ভাসছে দুটো কোয়াডকপ্টার, ঠিক যেন দুটো বাজপাখি হিংস্র চোখে লক্ষ্য করছে শিকারকে। মাথার উপর হাত তুলে যখন বেরিয়ে এল ক্রোম্যান, তখনও একজোড়া মেশিনগান তার দিকে তাক করে আছে। নির্দেশ এল হাত তুলে রেখেই বাঁদিকে এগোতে। হঠাৎ মাথায় একটা তীব্র যন্ত্রণা টের পেল ক্রোম্যান। ও বুঝতে পারল পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। সারা গা ভীষণ গরম হয়ে উঠছে, যেন শিরায় ধমনীতে রক্ত নয়, লাভাস্রোত বইছে। দুহাতে মাথা চেপে ধরল ও। যান্ত্রিক কণ্ঠে সতর্কবাণী উচ্চারিত হল। একটা আলোর ফ্ল্যাশ- টুকরো টুকরো হয়ে উড়ে গেল ড্রোনদুটো।
         দৌড়তে শুরু করল ক্রোম্যান- ডানদিকে। কিছুদূর গিয়ে গলিটা একটু চওড়া হয়েছে। একটা বিনের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে আছে দুজন লোক- সরকারি দাতব্য কমলা প্লাস্টিকের জ্যাকেট পরে; হাতের ট্যাবলেটে চোখ দুজনেরই। ক্রোম্যান দৌড়তে দৌড়তে থামতে তারা একবার মুখ তুলে তাকিয়ে ফের চোখ নামিয়ে নিল। পেছনের আকাশে বড় ফায়ারবার্ডটাকে দেখতে পেল ক্রোম্যান। ক্রোম্যানকে দাঁড়াতে দেখে একটু নিচে নেমে এল ওটা, সামনে একটা ছোট্ট দরজা খুলে বেরিয়ে এল একটা রকেট লঞ্চারের নল। ছিটকে পিছন ঘুরে দৌড়তে শুরু করল ক্রোম্যান। পিছন থেকে কানে এল একটা তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ। সামনের দিকে ছিটকে পড়ল ও। মনে হচ্ছে একটু দূরে একটা নীল আলো দুলছে… আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে আসছে সব। পড়ে রয়েছে কয়েকটা তোবড়ানো বিন, কিছু ভাঙা যন্ত্রপাতির টুকরো, দুটো ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া কমলা জ্যাকেট।

দৃশ্য ৩
         একটা বেশ বড় গোল ঘর, তিনদিকের দেওয়াল কাঁচের। সেখান দিয়ে সবদিকে অনেকদূর অবধি দেখা যাচ্ছে আকাশচুম্বী বহুতলের জঙ্গল। ঘরের ভেতর সিলিকন কোট-টাই পরা একদল লোক- একটা গোল টেবিল ঘিরে বসে আছে। কতকগুলো থ্রিডি ভার্চুয়াল ফাইল ঘোরাফেরা করছে টেবিলের উপর। একটি লোক ঢুকল, সবাই উঠে দাঁড়াল, আবার বসল- মিটিং শুরু হল। সবার শেষে আসা লোকটি হলেন দ্য গ্র্যান্ড গভর্নর, বেশ কয়েকটি হাইল্যান্ড নিয়ে তৈরি স্টেটের শাসনকর্তা। বাকিরা কয়েকজন গভর্নর, কয়েকজন পিস কমিটির অধিকর্তা, দু একজন ইঞ্জিনিয়ার ও প্ল্যানিং সেকশন স্টাফ। ‘প্রিন্সটাউন’ হাইল্যান্ডের আশেপাশের লোল্যান্ডে এক বিপজ্জনক ব্যক্তি ঘুরে বেড়াচ্ছে এই মুহূর্তে। ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এবং পিস কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী এই ব্যক্তি স্টেটের নিরাপত্তার সামনে একটি বড়সড় হুমকি। যতদূর জানা গেছে এই ব্যক্তি কিছু অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারী। তার শক্তির পরিমাপ জানা না গেলেও আন্দাজ করা হচ্ছে ইচ্ছা করলে সে গোটা স্টেটটিকেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। তাই জরুরি মিটিং, যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সমস্ত কর্তাব্যক্তিরা একত্রিত।
         সকলকে সম্ভাষণ করে কথা শুরু করলেন গ্র্যান্ড গভর্নর, একটা ছোট্ট বক্তৃতায় সকলকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝিয়ে দিলেন। তারপর সকলের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানালেন সমস্যার সমাধান সম্পর্কে নিজেদের পরিকল্পনা ও মতামত জানাতে। প্রিন্সটাউন গভর্নর একঘেয়েভাবে পিসফোর্সের সংখ্যা বাড়ানোর আর্জি পেশ করলেন। পিসফোর্সের অফিসার বললেন- “দেখুন, টার্গেটের কিছু আনন্যাচারাল পাওয়ার রয়েছে। আমরা প্রায় আমাদের সর্বশক্তি লাগিয়ে দিয়েছি, কিন্তু কিছু সুবিধা হচ্ছে না। ফেস টু ফেস ইন্টার‍্যাকশনে টার্গেট খুবই বিপজ্জনক এবং এ পর্যন্ত আমাদের প্রচুর ড্যামেজ করেছে। পিসফোর্সের সংখ্যা বাড়িয়ে কিছুই হবে না।”
আরেকজন গভর্নর বললেন- “আচ্ছা, এরকম কোন লোক পাওয়া যায় না, যে টার্গেটের আস্থাভাজন হতে পারবে? এরকম একজন লোক পেলে তাকে দিয়ে আমরা ওকে ট্রোজান হর্স ট্র্যাপ করতে পারি, কিংবা সে সরাসরি বিট্রে করে ওকে মেরে দিতে পারে সুযোগমত।”
পিসফোর্সের অফিসার এ প্রস্তাবও নাকচ করে দিয়ে বললেন- “টার্গেটের চলাফেরা খুবই রহস্যময় এবং অদ্ভুত। তার পরিচয়, বা কোন বন্ধুবান্ধবের পরিচয় সম্পর্কিত তথ্য আমাদের কাছে নেই। সে কোন ধরনের লোকদের মধ্যে থাকে, সেটাও খুব একটা পরিষ্কার নয়। প্রিন্সটাউন বেস লোল্যান্ডে টার্গেটের কিছু পরিচিতি আছে, ওখানে ও চ্যারিটি জাতীয় কিছু কাজকর্ম করে থাকে; তবে তা সবই ওয়ার্কার লেভেলে। বুঝতেই পারছেন, ওদের সঙ্গে নেগোসিয়েশন সম্ভব নয়।”
         এরপর বেশ কিছুক্ষণের ক্লান্তিকর আলোচনায় সকলেই যখন প্রায় হতাশ হয়ে পড়েছেন, তখন পিসফোর্সের অন্য একজন অফিসার, যিনি এতক্ষণ একটিও কথা বলেননি, আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। সকলের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে একটা অদ্ভুত ঠান্ডা গলায় বলতে আরম্ভ করলেন- “এইভাবে ভাবলে কোনদিনই কোন সমাধানসূত্র আসবে না। টার্গেটের পরিচয় বা উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক কথা হল, কিন্তু এগুলো এখন আমার মনে হয় না ভাবলেও চলবে। টার্গেটকে সরানোই এখন একমাত্র লক্ষ্য, সেটা নিয়েই ভাবতে হবে। টার্গেটকে ওয়ান ইজটু ওয়ান পজিশনে কোন দিন ড্যামেজ করা যাবে না। সারাজীবন ধরে চেজ করলেও কখনও জীবন্ত ক্যাপচার করা যাবে না। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমার প্রস্তাব, আমরা টার্গেটের লোকেশন ট্র্যাক করে যখন ওকে বেশ কিছুক্ষণের জন্য লোল্যান্ডে পাব, তখন নিউক্লিয়ার পাওয়ারড মিসাইল দিয়ে জোনাল ড্যামেজ করার চেষ্টা করব। আমার মনে হয় না টার্গেট অ্যাটমিক এক্সপ্লোশন সারভাইভ করতে পারবে বলে। তবে আমাদের কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে কম ক্ষমতাসম্পন্ন যে মিসাইলটি আছে, সেটি প্রয়োগ করলেও লোল্যান্ডটি সম্পুর্ন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। প্রিন্সটাউনেও বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। আমার টিমের কাছে টার্গেটের গতিবিধির ট্র্যাক রেকর্ড আছে, সেই ভিত্তিতে কিছু লোকেশনও ঠিক করা আছে। এবার…”
         বক্তব্য শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণের এক অস্বস্তিকর নীরবতা ভঙ্গ করলেন গ্র্যান্ড গভর্নরই- “প্রিন্সটাউন লোল্যান্ডের সমস্ত প্রোডাকশন লাইন যে বসে যাবে, বলা ভালো ধ্বংস হয়ে যাবে, তার বিকল্প ব্যবস্থা কি করা যাবে?”
প্রিন্সটাউনের গভর্নর বললেন- “কিছু কিছু হাইল্যান্ডে সরানো যেতে পারে, যেগুলো কোন দূষণ বা অন্যান্য সমস্যা সৃষ্টি করে না; অবশ্যই সিটিজেনদের অনুমতিক্রমে। স্টেটের অন্যান্য লোল্যান্ডে কাজের চাপ বাড়াতে হবে। বাকিটার জন্য বছরদুয়েক অন্য স্টেটের উপর নির্ভর করতে হবে। যদিও এতে ইকনমি অনেকটাই ধাক্কা খাবে।”
এর মধ্যে একজন ইঞ্জিনিয়ার, যিনি গভর্নিং কমিটির তরফ থেকে উপস্থিত ছিলেন, উত্তেজনার বশে প্রায় চেঁচিয়ে ফেললেন- “কিন্তু লোল্যান্ডের এতগুলো মানুষ, তাদের কি হবে?”
গ্র্যান্ড গভর্নর একটু অবজ্ঞাভরে উত্তর দিলেন- “এ বিষয়ে আপাতত করার কিছু নেই। স্টেটের ইকনমি বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে চলেছে। এর উপর লোল্যান্ডের লোকেদের জন্য আলাদা ব্যয় করা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। পরবর্তী সময়ে আমরা কিছু বন্ধু স্টেটকে অনুরোধ করতে পারি লোল্যান্ডের বার্থ রেট কিছু বাড়িয়ে আমাদের এক্সপোর্ট করতে, তবে সেটা নিয়ে ভাবার সময় এখন নেই। প্রিন্সটাউনের সিটিজেনরা এক মারাত্মক বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, সবার আগে তার ব্যবস্থা করতে হবে”
ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোক হতভম্ব হয়ে অস্ফুটে বললেন- “স্রেফ সম্ভাবনা দেখে এতগুলো প্রাণ?” কিন্তু তাকে নিয়ে আর কেউ বিশেষ মাথা ঘামাল না। প্রিন্সটাউনে যে সামান্য ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তা কতটা আশঙ্কাজনক এবং কিভাবে তার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া যায় সে সম্পর্কে একপ্রস্থ আলোচনার পর মিটিং শেষ হল। আস্তে আস্তে ঘর ফাঁকা হয়ে গেল, বিধ্বস্তের মত একটা চেয়ারে বসে রইলেন একজন, একা। স্মার্ট সিস্টেম এক এক করে আলো নেভাতে শুরু করল।

দৃশ্য ৪
         পিটইয়ার্ডের সেই সরু রাস্তা, সেই ছোট্ট ঘর, মুখোমুখি দ্য টিচার এবং ক্রোম্যান। তবে সেই রহস্যময় আলো আর ছবিগুলো নেই, নেহাতই সাদামাটা একটা ঘর। আসবাব বলতে একটা টেবিল, দুটো চেয়ার, একটা বড় বাক্স, আর একটা ধাতব কলসী। ঘরে ঢুকলে মনে হবে এক ধাক্কায় দেড়শ বছর পিছিয়ে গেছে সময়। ক্রোম্যান এবং দ্য টিচার টেবিলের দুদিকে মুখোমুখি বসে আছে; টেবিলের উপর একটা কাগজে ছাপানো বই, আর কিছু কালো কাপড়ের মত জিনিস ভাঁজ করে রাখা। ক্রোম্যানের পরনে একটা কালো লেদার জ্যাকেট, মাথায় কালো স্কাল ক্যাপ। দ্য টিচার কাপড়ের মত জিনিসগুলো ঠিকঠাক করে গুছিয়ে রাখছিলেন, মাথা তুলে তাকাতেই ক্রোম্যানের মাথায় চোখ পড়ল; বললেন- “চুলগুলো আর দু-একদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে।”
– কিন্তু সারাগায়ে অনেক জায়গায় আঘাত লেগেছিল, সেসব ক্ষতচিহ্ন দেখতে পাচ্ছি না তো?
– এই মুহূর্তে তোমার শরীরে ইমিউনিটি এবং হিলিং পাওয়ার সাধারণ মানুষের চেয়ে কয়েকহাজার গুণ বেশি। তাছাড়া তোমাকে আমি কিছু ওষুধ দিয়েছিলাম, তোমার মনে নেই, তুমি তখন অজ্ঞান হয়ে ছিলে।
– আমি এখানে কিভাবে এলাম? এই জ্যাকেটটাই বা কোথা থেকে এল?
– আমি নিয়ে এসেছি তোমাকে ওখান থেকে উঠিয়ে, আর জ্যাকেটটা আমারই।
– আমার পুরোনো জ্যাকেটটা কোথায়? সেটা ওদের হাতে পড়লে ওরা ওটা থেকে স্যাম্পেল নিয়ে আমার অ্যান্টি ডিএনএ বানিয়ে ফেলবে।
– ওটা আমি নিয়ে এসে নষ্ট করে ফেলেছি।
– এই কালো কাপড়গুলো কিসের?
– এগুলো অ্যান্টি-গ্রেজার ক্লোক, এটা পাঁচ থেকে সাত সেকেন্ড কাউকে যেকোন ফ্রিকোয়েন্সির লেজারের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে। সেটুকু সময় কোন হাইল্যান্ডের লেজার ব্যারিয়ার পেরোনোর জন্য যথেষ্ট। এগুলো আপাতত তোমার জন্যই আনা হয়েছে।
– তার মানে আমাকে এখন হাইল্যান্ডে যেতে হবে? কিন্তু আমি লোল্যান্ডের সমস্ত কাজ ফেলে এখন হাইল্যান্ডে যাব কেন?
– দেখো, প্রিন্সটাউনে একটা মিটিংএ ঠিক হয়েছে পিসফোর্স তোমার সঙ্গে আর কোন ফেস টু ফেস ইন্টার‍্যাকশনে আসবে না; তার বদলে ওরা এখন নিউক্লিয়ার পাওয়ার্ড মিসাইল ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। সেজন্য দ্য পাপেটিয়ার চাইছেন তুমি আপাতত হাইল্যান্ডেই থাকো।
– সেটা নাহয় হল, কিন্তু এই ‘দ্য পাপেটিয়ার’টি কে? আগেও এঁর নামে কিছু নির্দেশ শুনেছি, ইনি হঠাৎ তার পাপেট হিসাবে আমাকে বেছে নিলেন কেন? আমাকে পাপেট বানানোর অধিকারই বা কে দিল তাকে?
– হুমম। এই প্রশ্নগুলো আমি অনেকদিন আগেই আশা করেছিলাম, তবে তুমি কিছু জিজ্ঞাসা করোনি, নিজেই উদ্যোগী হয়ে কাজ করতে শুরু করেছিলে, তাই কিছু বলিনি। আজ জিজ্ঞাসা করলে যখন, শোনো।
         এই দ্য পাপেটিয়ার ছিলেন একজন দারুণ প্রতিভাবান বিজ্ঞানী। তাঁর কাজের বিষয় ছিল- ‘শক্তি এবং তার বহুমাত্রিক অস্তিত্ব’। তাঁর কাজকর্ম তাঁর সমসাময়িকদের কাছে কিছুটা অলৌকিক গোত্রের ছিল, তাই তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন না। তিনি নিজেও বেশ গোপনীয়তা বজায় রাখতে পছন্দ করতেন। তিনি বিভিন্ন শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছিলেন। তবে, তাঁর গবেষণার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়েও চিন্তিত ছিলেন। তাঁর প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল মানবসমাজে ক্রমবর্ধমান অসাম্য এবং হিংসা। সেজন্যই বোধহয় তিনি তাঁর বিশাল সম্ভাবনাময় আবিষ্কারগুলি জনসাধারণের হাতে তুলে দিয়ে যাননি। তিনি চাননি স্টেটের অস্ত্রাগারে আরো ক্ষমতাবান কিছু মারণাস্ত্র জমা হোক। তবে, তিনি নিজে কিছু কিছু কাজ করার চেষ্টা করে গেছেন গোপনে; যেমন বেশ কিছু নতুন যন্ত্রপাতির প্রচলন করেন যেগুলোর আবিষ্কর্তার নাম তোমরা জানো না। আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে এক অদ্ভুত এবং বিপজ্জনক পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি ভৌত মানবদেহ হিসাবে অস্তিত্ব হারিয়েছেন, তবে তাঁর চেতনা এখনও সক্রিয় এবং তাঁরই আবিষ্কৃত কিছু যন্ত্রের সাহায্যে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম। এই পরীক্ষাটি যদিও তাত্ত্বিক দিক থেকে সফল হয়েছিল এবং এর ফলস্বরূপ তিনি বিভিন্ন মাত্রায় বিপুল পরিমাণ শক্তির উপর নিয়ন্ত্রন পেয়েছেন। তোমার এইসব অদ্ভুত ক্ষমতা তার সামান্য কিছু নমুনা মাত্র।
– কিন্তু কোন ভৌত পদার্থ ছাড়া চেতনার অস্তিত্ব কিভাবে সম্ভব?
– এই প্রশ্নটা আমিও তাকে করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন সম্ভব নয়। তবে তাঁর বস্তুগত অস্তিত্ব কোথায় কোন মাত্রায় আছে সেকথা তিনি বলেননি।
– আচ্ছা, সে যাই হোক, আমাকে এসবের মধ্যে নিয়ে আসা হল কেন? আমার এখানে উপস্থিত হওয়াও নিশ্চয়ই তার ইচ্ছায়?
– না, তিনি কারো সম্পূর্ন সচেতন সম্মতি ছাড়া তাকে নিজের কাজে নিযুক্ত করেন না। আমিই তোমাকে টেনে এনেছিলাম, কারণ আমার একজন অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ প্রয়োজন ছিল। এই সময়ে এরকম মানুষ খুব বিরল, সেজন্য আমি তোমার সম্মতির অপেক্ষা করে ঝুঁকি নিতে চাইনি। যদিও, এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আমার মতবিরোধ আছে।
– আচ্ছা, আপনিও তো তাঁর হয়ে কাজ করছেন। আপনাদের, বা এখন আমাদের উদ্দেশ্যটি কি?
– উদ্দেশ্য পৃথিবীতে শান্তি, সাম্য এবং মৈত্রী ফিরিয়ে আনা। হাইল্যান্ড-লোল্যান্ড বিভাজন ভুলে সব মানুষ যাতে আবার পাশাপাশি এগোতে পারে সে চেষ্টা করা। মানুষ এবং হাইব্রিড গবাদি পশু ছাড়া আর যে গুটিকয় প্রাণী বেঁচে আছে, তাদের রক্ষা করা। সম্ভব হলে পুরোনো জীববৈচিত্র ফিরিয়ে আনা। পৃথিবীকে আবার তার সুন্দর,স্বাভাবিক, স্বাস্থ্যকর রূপ ফিরিয়ে দেওয়া। এরকমও বলা যায়- মানুষ এবং প্রকৃতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।
– কিন্তু তিনি বিপুল ক্ষমতার অধিকারী, চাইলেই ইচ্ছামত সাজিয়ে দিতে পারেন সব।
– ব্যাপারটা অত সহজ নয়, তবে অনেকটাই পারবেন চাইলে। কিন্তু, তাঁর উদ্দেশ্য নয় উপর থেকে কেউ কিছু চাপিয়ে দিক। তিনি চান পৃথিবী সুন্দরের সঙ্গে সঙ্গে আনন্দময়ও হবে। সেজন্য পরিবর্তন আসতে হবে মানুষের অন্তর থেকে। তাঁর ইচ্ছা, আমরা মানুষের মধ্যে থেকে কাজ করতে করতে ছড়িয়ে পড়ব সারা পৃথিবীতে। আশেপাশের মানুষকে চিন্তার সুযোগ করে দেব, তাঁদের চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করব। দ্য পাপেটিয়ারের ইচ্ছা হিংসাত্মক কার্যকলাপ এড়িয়ে চলা, কারণ তিনি বলেন হিংসাই প্রতিহিংসার জন্ম দেয়। তবে আমার মতে, কিছুমাত্র ধ্বংস না করে নতুন সৃষ্টি অসম্ভব; এবং তিনিও সেটা কিছুক্ষেত্রে মেনে নিতে প্রস্তুত। তিনি কোনকিছুর উপরেই নিজের ইচ্ছা বা মতামত চাপিয়ে দিতে চান না।
– আমারও মনে হয় সংঘর্ষ সম্পূর্ণ এড়ানো যাবে না, কারণ পূর্ণবয়স্ক মানুষের মানসিকতা হঠাৎ করে বদলানো যায় না। তবে আমি এটাও আশা করি কিছু কিছু মানুষ সবসময়েই শুভচেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের দিকে আসবে; দেখা যাক। তাহলে, এই মুহূর্তের পরিকল্পনা কি?
– তুমি আপাতত প্রিন্সটাউনে যাচ্ছ। ওখানে ঢুকে পড়ার পর তোমার ফলস সিটিজেন আইডেন্টিটি বানিয়ে দেওয়া হবে। নতুন কোন ঝামেলা না হলে আপাতত ওখানেই থাকবে। মাঝেমধ্যে ওই আইডেন্টিটিতেই বিজনেস টুরের নামে লোল্যান্ডে আসতে পারবে। যদিও আপাতত কিছুদিন লোল্যান্ডের কাজ বন্ধ থাকলে খুব একটা অসুবিধা হবে না। এই সময়টা তুমি কিছু পড়ারও সুযোগ পাবে। কিছুদিন পর তুমি আর পিসফোর্সের টার্গেট থাকবে না, তখন পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির করা হবে।
– আমি তাহলে এখনই বেরিয়ে পড়ি?
– হ্যাঁ চলো, আমিও যাব কিছুদূর তোমার সঙ্গে। একটু দাঁড়াও, কয়েকটা জিনিস দেখে আসি।
– আচ্ছা, আমি অপেক্ষা করছি।
দ্য টিচার একটা ব্যাগ নিয়ে আসেন ভেতর থেকে। “এ নাও, ক্লোকগুলো এই ব্যাগটায় ভরে নাও। এই বইটাও, তোমাকে দিলাম এটা।”
– ধন্যবাদ।
– ক্রোম্যান..
– কি?
– তুমি কখনও গাছ দেখেছ? নিজের চোখে?
– না, থ্রিডি মডেল দেখেছি কিছু।
– চলো, আজ তোমাকে সত্যিকারের গাছ দেখাব। দেখবে, কাছে গিয়ে একটু দাঁড়ালেই কেমন যেন মনটা ভালো হয়ে যায়।
পিটইয়ার্ডের ধুলোভরা রাস্তায় তখন সন্ধ্যা। দুটো মানুষ হাঁটতে হাঁটতে ছোট হয়ে মিলিয়ে যেতে থাকে। আস্তে আস্তে অন্ধকার নেমে আসে, তবুও কিছু আলোর রেখা দেখা যায় চারিদিকে। বিষণ্ণ সন্ধ্যায় আশার আলোর মত বেঁচে থাকে তারা।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s