লোকটা

একদিন আমি পথে যেতে যেতে দেখেছিলাম লোকটাকে।
লোকটা নাচছে।
লোকটাকে ঘিরে ধরেছে লাউডস্পিকারের জান্তব গর্জন,
আর রঙিন উজ্জ্বল আলোগুলো ঝলসে দিয়ে যাচ্ছে লোকটার মুখ।
তবু লোকটা নেচে যাচ্ছে।
হয়ত আগের দিনই ছিল লোকটার মাসমাইনের দিন,
অথবা হতেও পারে লোকটা তিনমাস মাইনে পায়নি;
বা কারখানাটাই বন্ধ হয়ে গেছে আজ বছরখানেক হল।
লোকটা সেসবের পরোয়া করে না।

যে ঘিঞ্জি গলিটা লোকটাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়,
নর্দমার পঙ্কিল দুর্বোধ্যতা আর পুরসভার জঞ্জালের গাড়ির পাশ কাটিয়ে,
যেখানে কিছুদূর অন্তর জমে থাকা কালো জল
সাইনবোর্ডের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে;
হয়ত সেখানেই কাল রাতে শুয়ে ছিল 
একটা মরচে ধরা মৃতদেহ,
কয়েকটা নির্বিবাদী থানইঁটের পাশে;
লোকটা ইঁটের উপর পা দিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখেও স্বচ্ছন্দে এগিয়েছিল,
আর তাকে পথ দেখিয়েছিল সাইনবোর্ডের আলো।
লোকটা জানে এরকম রাত আসে,
যায়।
লোকটার তাতে কিছু আসে যায় না।

আমি জানি না,
ত্রিপল আর চট ঘেরা পায়খানা পেরিয়ে যে ঝুপড়িটায় লোকটা থাকে,
উল্টোদিকের ছাপ্পান্নতলা বাড়িগুলো পেরিয়ে সেখানে কখনও সূর্যের আলো পৌঁছয় কিনা।
সেখানেই কোন এক স্যাঁতস্যাঁতে বদ্ধ ঘরে,
যদি বছরদুয়েক আগে থেমে গিয়ে থাকে শিশুর কান্না।
সেকথা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।
হতে পারে লোকটার সেকথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে।
হতে পারে সে যখন রাতের অন্ধকারে ঘরে ফেরে,
কান্নার শব্দটা ভারী হয়ে চেপে বসে আবছা হলুদ আলোয়।
তবু ভোটের সময় যখন নতুন দিনের আগমনধ্বনিতে কান ঝালাপালা হয়ে যায়,
লোকটা সেসবে পাত্তা দেয় না।
কারণ সে দেখেছে, 
নতুন লোক আসে, নতুন দিন আসে না। 

পথের ধারে ছোট একটা শামিয়ানা,
অমানুষিক উল্লাসের বার্তাবহ দুটো লাউডস্পিকার,
আর শিরায় শিরায় দিশি মদের উত্তপ্ত প্রবাহ,
এইটুকু মাত্র সম্বল করে লোকটা পাগলের মত নেচে যায়।
সমস্ত বোঝা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে
হাত পা টানটান করে মেলে দিতে চায় ধোঁয়াশা ভরা সন্ধ্যার আকাশে।
কিন্তু রাত শেষে আবার শিকলে টান পড়ে,
লোকটা নিজেকে গুটিয়ে ছোট করে নেয়,
আমি জানি না,
লোকটার কানে কেউ শিকল ভাঙার মন্ত্র পৌঁছে দিয়েছে কিনা।

গীতার অমোঘ বাণী কি পৌঁছেছে কর্পোরেটের হাত ধরে?
‘কর্ম করে যাও, ফলের আশা কোরো না।’
লোকটা যখন প্রতিদিন দশ ঘন্টারও বেশি মেশিনের চাকায় নিজেকে পিষে দিয়ে বেরিয়ে আসত,
সে বিশেষ কিছু আশা করেছিল কি?
নেশার ঘোরে ছিবড়েটা হেঁটে হেঁটে বাড়ি আসে।
টেলিভিশনের রঙিন আলো কাঁচের বোতলে প্রতিফলিত হয়ে আরো রঙিন হয়ে ওঠে।
প্রেসার কুকারের আওয়াজের অনুপস্থিতি
পূরণ করে উত্তপ্ত শব্দস্রোত,
চৌকো পৃথিবী জুড়ে থাকে খেলাযুদ্ধ কিংবা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা,
কান্না আর দম আটকানো কষ্টগুলো তখন ভাঙা চৌকিটার নিচে লুকিয়ে পড়ে।

যদিও বোমা, বন্দুক, ছুরি শব্দগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ায়,
দিনগুলো বিনা রক্তপাতে কেটে যায়।
শপিং মল ঘোষণা করে মে দিবসের আকর্ষণীয় ছাড়।
রাস্তার ধারে নাচতে থাকা লোকটাকে ফালাফালা করে দিয়ে যায় একটা হেডলাইটের আলো,
লোকটার বিকৃত অঙ্গভঙ্গির ছায়া পড়ে পাশের ফ্ল্যাটবাড়ির দেওয়ালে,
কোন এক এলিট বুদ্ধিজীবীর ব্যালকনি থেকে ছবিটা চেনা চেনা লাগে,
টেবিলে আনন্দবাজারের পাতায় শুয়ে থাকে মাটি খুঁড়ে উদ্ধার হওয়া নরকঙ্কাল।
এক ঝলকের জন্য বেআব্রু হয়ে পড়ে তিলোত্তমা;
লোকটার তাতে কিছু এসে যায় না।

তাপমানযন্ত্র বলছে,
একটা প্রবল ঘূর্ণিঝড় ক্রমশ শক্তি বাড়াচ্ছে বস্তির এই নোংরা কালো ত্রিপলগুলোর নীচে।
কিন্তু সেই ঝড়টা ওই ছাপ্পান্নতলা বাড়িগুলোর দিকে এগোচ্ছে কিনা,
সে সম্পর্কে কারো কাছে কোন খবর নেই।
সূর্যের আলো এখনো পর্যন্ত বিনামূল্যে পাওয়া যাচ্ছে,
যদিও ছাপ্পান্নতলার ছাদ পেরিয়ে বস্তিতে পৌঁছে দেওয়ার মত পরিকাঠামো নেই;
সেজন্য উঠোনে জমে থাকা তৈলাক্ত কাদাজলে রঙের খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বস্তির শিশুরা।
লোকটা সেসব নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয়,
আর সেরকমই নিশ্চিন্তে আছে হাঁটু আর বুকের কাছে লাগা কালির দাগগুলো।

সেই লোকটা নেচে যাচ্ছে, 
দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে।
ঠোঁটের কোণা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালা,
আর রঙিন উজ্জ্বল আলোগুলো ঝলসে দিয়ে যাচ্ছে লোকটার মুখ।
লাউডস্পিকারের জান্তব গর্জনে চাপা পড়ছে জন হেনরির হাতুড়ির সুর।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s