খামারবাড়ির রূপকথা

এক যে গাধা, বনের ধারে তার মালিকের খামার বাড়ি।

খাবার ছিল যৎসামান্য, কাজের বহর খুবই ভারী।

দুই পা গেলে চাবুক ছিল, মাথা তোলার জো ছিল না,

তবুও সে দিব্যি ছিল, মানিয়ে নেওয়ার নেই তুলনা।

স্বাধীনতা স্বপ্ন বিলাস, আপোস হল কাজের কথা

পেটের আগুন নিভলে পরে আর কিছু নেই মাথাব্যথা।

একদিন এক বন্য হরিণ পড়ল এসে শান্ত দেশে

চারিদিকে সব দেখেশুনে খুবই অবাক হল শেষে

গাধার গলায় বাঁধা দড়ি, তার উপরে শেকল পায়ে

চাবুকের দাগ ডোরাকাটা বাঘের মত সারা গায়ে

সামনে রাখা গামলা দেখে হরিণ শুধায় খাবার কোথায়?

গাধা বলে ওই আছে ভাই কষ্টেসৃষ্টে দিন চলে যায়।

কাজের ফিরিস্তি শুনে ঘাবড়ে গিয়ে বলে হরিণ

এরম করে চললে পরে বাঁচবে তুমি আর কটা দিন?

দুঃখী হাসি গাধার মুখে, সেকথা আর কেন বলা

মরে আমি আগেই গেছি, আছে শুধু পেটের জ্বালা।

হরিণ বলে মরোনি বটে, বাঁচার কথা গেছ ভুলে

অরণ্যে পালিয়ে চলো, বাঁচবে সেথায় মাথা তুলে।

গাধা শুনে চমকে ওঠে, বনে তো বাঘ আছে ভাই

হরিণ হেসে বলে থাকুক, উঠতে বসতে চাবুক তো নাই

নদী আছে, ঝরনা আছে, এদিক সেদিক অঢেল খাবার

খোলা মাঠ সবুজ মোড়া, বাধা নেই কোথাও যাবার।

তবু যে ভয় লাগে ভাই- গাধার কথায় হরিণ রাগে

বনের বাঘে খাবার আগেই তোমায় খেল মনের বাঘে।

বুড়ো হয়ে বসবে যখন, মালিক কসাইখানায় দেবে 

কিংবা তার আগেই হয়ত অত্যাচারে প্রাণটা যাবে

সেকথাতে ভয় লাগে না, দোষ কেবল বনের বেলাই

পায়ে বেড়ি দিয়েছে মালিক, মনের শিকল কে দিল ভাই?

গাধার মরা মাছের চোখে জ্বলে বুঝি ক্ষীণ আলো

মরতে যখন হবেই শেষে, নিজের মত মরাই ভাল।

তবে কিনা তারও আগে, বেঁচে নিতে হবে খানিক

খুঁজেপেতে দেখলে যদি মনের কোণায় মেলে মানিক।

কালের পথে কতদূরে কোথায় পড়ে গেছে আশা

কোথায় জানি আছে খুশি, কোথায় গেছে ভালোবাসা

বহু যুগের অন্ধকারে কোন পথে আজ ঢুকল আলো

পড়ছে আজ সবই মনে, বাঁধ মানে না চোখের জলও।

কিন্তু ভাই, যাই কেমনে, দুপায়ে যে শিকল বাঁধা

তার উপরে গলায় দড়ি, দুশ্চিন্তায় বলে গাধা

হরিণ বলে চিন্তা কি ভাই, উপায় একটা হবে ঠিকই

পায়ের শিকল মালিক তোমার কখন খোলে বলো দেখি

গাধা জানায় রাত্রিবেলা শিকল থাকে বটে খোলা  

কিন্তু ঘরের ভেতর বেঁধে দরজা এঁটে ঝোলায় তালা।

হরিণ ভাবে নামিয়ে মাথা চুপটি করে দুই দন্ড

তারপরেতে দেখতে গিয়ে লাফিয়ে ওঠে- ‘একি কান্ড!’

দরজায় তালা কোথায়, হুড়কোই নেই আস্তাবলে

গাধা বলে ব্যাপার বোঝো, গাধা কি আর সাধে বলে

দশ বছর জানি তালা, ঠেলে দেখিনি বন্ধ কিনা

প্রিয় বন্ধু, মুক্তি আমার কেমনে হত তুমি বিনা?

হরিণ বলে নিমিত্ত আমি তোমার মুক্তি তোমার হাতে

বিলম্বে কাজ কি আর, প্রস্তুত থেকো আজই রাতে।

রাত্রি যখন গভীর হবে, ঘুমের ঘোরে মগ্ন সবাই

আসব আমি এমনিভাবেই, তুমি কিন্তু জেগে থেকো ভাই

নিঃশব্দে দরজা ঠেলে বেরিয়ে পড়ব দুজনাতে

ভোরের আলো ফোটার আগেই মিশে যাব অরণ্যতে

দেখবে সেথায় মুক্তির আলোয় সূর্য ওঠে কেমন রাঙা

মিষ্টি হেসে বলবে তোমায় সার্থক তোর শিকল ভাঙা।

রাত্রির পথে বিপদ অনেক, পেরিয়ে যাব পাশাপাশি,

স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রেখো, আসব আবার, এখন আসি।

মুক্ত হরিণ ডিঙিয়ে বেড়া মিলিয়ে গেল গহীন বনে।

কিন্তু সে যে কিসের আগুন জ্বেলে গেল গাধার মনে

কোনও কাজে মন লাগে না, শেকলে পায়ে লাগে ব্যথা,

জ্বালা করে ওঠে গায়ে, এদ্দিন এ ছিল কোথা?

মাথা তুলে আকাশ দেখে, অবাক হয় নিজের মনে,

মালিকের হেঁড়ে গলা ঢুকতেই চায় না কানে।

পিঠে চাবুক আছড়ে পড়ে, গাধা ঘাড় ঘুরিয়ে চেঁচায়,

প্রত্যাঘাতের ইঙ্গিত পেয়ে মালিক যেন ভয় পেয়ে যায়।

তাড়াতাড়ি সন্ধে নামে, চলে আসে গাধার খাবার

নিঃশ্বাসে গামলা খালি, তাড়া যেন যুদ্ধে যাবার,

তারপরে নজর পড়ে বোঝাই করা শস্যদানা

বেয়াদবিতে অবাক মালিক, চাবুক নিতে হাত সরে না।

গাঢ় হয় আকাশের রঙ, এদিকে আস্তাবলে

উত্তেজনার প্রহর গোনা, অস্থির পায়চারি চলে।

এমন সময় কড়ি কাঠে গাধা অবাক দেখে একি!

মালিকের ছায়াসঙ্গী, অতি আদরের টিয়াপাখি।

আজ যে বড় আস্তাবলে? গাধা সঙ্কোচে দাঁড়ায়,

খবর পেয়ে এলাম ভাই- মধু ঝরে টিয়ার গলায়

শুনলাম বনের হরিণ এসেছে নাকি তোমার কাছে,

সাবধান করতে এলাম, তোমার বিপদ ঘটে পাছে।

গাধা বলে কিসের বিপদ? ভয়ের কিছু নেইকো জেনো

টিয়া বলে না গো মশায়, তাহলে বলি শোনো।

বনে যে বাঘ আছে না, তার নাকি ব্যারাম ভারী

ব্যথার চোটে নড়তে-চড়তে পারে না তাড়াতাড়ি,

তার এক দোসর আছে, হরিণ এক, বনেই থাকে,

ভুলিয়ে নিয়ে যেতে চায়, সাদাসিধে বোঝে যাকে,

নিয়ে গিয়ে পথ ভুলিয়ে, ফেলে সেই বাঘের ডেরায়

নিস্তার আছে যমের হাতে, বনের বাঘ কভু না ফেরায়।

রাস্তা শুধু চেনে হরিণ, বাঘের সাথে তার খুব ভাব

এবারে বোঝো কেমন, বাঘেরও লাভ, হরিণেরও লাভ।

হরিণের ভয়ানক লাভ, তাতে আর সন্দেহ নাই,

গাধা বলে কি বলব আর, তুমি আমায় বাঁচালে ভাই।

টিয়া বলে এ আর কি ভাই, তুমি তো আমাদেরই লোক,

আমরা কি চাইতে পারি কখনও তোমার কোন ক্ষতি হোক?

হরিণব্যাটা এসেছে শুনে তাঁর ভারী ভাবনা হল,

বলেন কি দেখো গিয়ে ওকে বুঝি বাঘেই খেল।

আমিও ভাবি নিশ্চয় কেউ কুমন্ত্রণা দিয়েছে কানে

নইলে এমন সর্বনেশে কথা আসে কখনো কারো মনে,

খাবারের নেই ঠিক ঠিকানা বর্ষায় নেই মাথায় ঢাকা

এই বা বুঝি ধরল বাঘে সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকা।

গাধাও ভাবে ছাদ থাকতে কে যেতে চায় বনবাসে

হোক না কম, তবু তো রোজ ঠিক সময়ে খাবার আসে।

হরিণ ব্যাটা ছন্নছাড়া, পালিয়ে বেড়ায় হেথা সেথা

একটু মানিয়ে গুছিয়ে নিলে, এমন আরাম পাব কোথা?

আসলে পরে রাত্রিবেলা, বুঝিয়ে তাকে বললে পরে

হয়ত সে ভালো ভেবেই থেকে যাবে আমার ঘরে।

দু মুঠো ঠিক জুটে যাবে, ফিরতে আর হবেনা বনে

টিয়া আছে, ওই না হয় মালিককে বলবে’খনে

সে কথা বলতে পরে টিয়াপাখি দারুণ খুশি

সে বলে- হবে বইকি, যা ভাবছ তারও বেশি।

খামারবাড়ির অতিথি সে, আসছে তোমার নিমন্ত্রণে

আপ্যায়নে ত্রুটি না হয়, সে চিন্তাই সবার মনে।

ব্যবস্থা সব করাই আছে, তুমি ভাই নিশ্চিন্তে থেকো,

সে এসে পড়লে পরে একটিবার আমায় ডেকো।

নিশুত রাতে হরিণ যখন পৌঁছে গেছে গাধার ঘরে

টিয়ার কথা মত গাধা ডাক ছেড়েছে তারস্বরে,

হরিণ শুনে থমকে দাঁড়ায় উঠোনপানে যেতে যেতে

খামারবাড়ি কেঁপে ওঠে বন্দুকের গর্জনেতে,

আঁতকে উঠে লাফায় গাধা, বেরোতে যেই গেছে ছুটে

দরজায় ঠোকে মাথা, শেকল বাঁধা কাঠের খুঁটে।

আস্তাবলের ভেতর থেকে চেঁচিয়ে মাথায় তোলে পাড়া

না দেখা দেয় টিয়াপাখি, না হরিণের আছে সাড়া।

সেই রাতেরও সকাল হয়, বনের মাথায় সূর্য ওঠে,

খামারবাড়ির কাজ শুরু হয়, চাবুক পড়ে গাধার পিঠে।

সবই আছে নিয়মমত, কালকে রাতের চিহ্ন কোথায়?

বনের পানে চাইলে পরে আগের মতই ঝাপসা দেখায়।

তারই মধ্যে খেয়াল করে গাধার মনে ভরসা জাগে

শেকলে আর টান পড়ে না, যেমনটা ঠিক ছিল আগে।

স্বপ্ন? তবে তাইই হবে, না জানি ছিল কিসের ঘোরে,

এই বন্ধন ভগবানের, কেউ কখনও কাটতে পারে?

কিন্তু যদি স্বপ্নই হয় কাঁটাতার পড়ল কেন?

দরজায় হুড়কো এল, খাবারের ভাগও কমতি যেন।

ভেবেও ভাবে না গাধা, ভাবনাচিন্তা তার জন্য নয়

ভাবতেই পারত যদি তবে কি আর এ অবস্থা হয়?

কি অবস্থা, সে জানে না, জানার বিশেষ ইচ্ছেও নেই

অত জেনে করবে টা কি? গাধা ‘খুশি’ এ জীবনেই।।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s