বীরপুরুষের মা

গল্পটা যখন শুরু হচ্ছে, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। লকডাউনের জেরে রাস্তাঘাট শুনশান। বীরপুরুষ ও তার মা একটা ছোট্ট ঘরে বসে চা খাচ্ছিল। তেজ কমে আসা টিউবলাইটের আলোয় ঘরের সামান্য কয়েকটি আসবাবপত্রকে একটু মনমরা দেখাচ্ছে। এই গল্পে বীরপুরুষের নাম মনো তাই তার মাকে সকলে মনোর মা বলেই চেনে।

টিভিতে দুটো লোক সমানে তর্ক করে যাচ্ছে। টিভির সামনে বসা মানুষদুটোর তাতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য সরকার কিছু করল কিনা, লকডাউন বাড়ানো সরকারের ব্যর্থতা না সাফল্য, তাতে তাদের কিচ্ছু এসে যায়না। যাদের নিয়ে গোটা দেশের বিদ্বজনেরা চিন্তিত, তারা বহুদিন আগেই এসবের ঊর্ধ্বে চলে গেছে। একটু আগেই বাইরে বেরনো নিয়ে বীরপুরুষ আর তার মায়ের একচোট ঝগড়া হয়ে গেছে। মনো রাগ করে ঘরের একমাত্র জানালার সামনেটুকু দখল করেছে। সামনের দুটো ফ্ল্যাটের ফাঁক দিয়ে আকাশের সারাংশ যেটুকু দেখা যায়, তাতে এখন বৃষ্টির পূর্বাভাস।

টিভিটা মাঝে মাঝে ঝিরঝির করে ওঠে, আবার নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। অনেকদিন তো হল; সেই মানুষটা থাকতে নিয়ে এসেছিল কবে, এখন ঠিকঠিক মনেও পড়ে না। তারপর গঙ্গা দিয়ে জল অনেক গড়িয়েছে, মনোর মা-র একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। কি দরকার বাপু জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ? সেই তো কারখানাও বন্ধ হল, সেই কেউ একটি ট্যাকাও পেল না, মাঝখান থেকে…

ওই একফোঁটা চা আর ওইটুকু আকাশ নিয়ে বেশিক্ষণ মুখ ফিরিয়ে থাকাও যায় না। মায়ের মুখের ভাব দেখে মনোর রাগ পড়ে গেল। প্যান্টুলুনের দড়িটা আঙুলে পাকাতে পাকাতে বলল, ‘মারে, আবার যে জল এলো দেখি’

‘জানালাটা এট্টু টেনে দে না!’

‘থাক, জোরে এলে দেব’খন।’

মনোর মা উঠে গিয়ে কৌটো-বাটা টেনে চাল বের করে। শব্দের তুলনায় চাল খুব কমই বেরোয়। টিভিটা বন্ধ করে মনো মায়ের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।

‘চুলে এট্টু সরষের তেল দিস না কেন রাক্কুসি, দুফোঁটা নিলে তেল কি তোর ফুরিয়ে যাবে?’

‘মেলা বকিস না। আসবে কয়থেকে রে? তিনমাসের আগে রেশনে একবারই তেল দিছিল জানিস?’

‘ওরে এবারে আবার দেবে রে, কাল টিভিতে বলল শুনলি নে?’

‘দিক আগে!’

‘এবার যেদিন দেবে সেদিন আমি ক্ষার-সাবানে মাথা ঘষে অ্যাত্তোটা তেল দেব দেকিস! সেদিন তোকেও তেল দিয়ে দেব মাথায়, বললে শুনব না।’

মনোর মা কৌটো থেকে দুমুঠো মুড়ি দেয় পিঁড়ির উপরে। মনো অভ্যেসমত বাঁ-হাতটা বাড়িয়ে দিল।

‘বাতাসা নেই। কাল বললাম না ফুরিয়েছে!’

‘তুই এনে রাখলিনে কেন?’

‘এখন দোকান খোলে নাকি, পুলিসে ধরবে না?’

‘সকালে বেনে, পকা সব দোকান খোলে, আমারে শেখাস না। কালকেরে যখন চাল নিতে যাবি বেনের দোকান থে নে আসিস।’

কিছুক্ষণ পরেই ভাত আর কাঁচকলার খোসা ভাজা ধোঁয়ায় ঘর ভরে গেল। মনো দেখল এই সুযোগ, সে একছুটে গলির মুখে গিয়ে দাঁড়াল। কিছু দুরে একটা ঝামেলা হচ্ছে। একপা-দুপা করে এগিয়ে ও যখন প্রায় ওদের মধ্যেই গিয়ে পড়েছে, তখন মনোর মা তাকে ধরে নিয়ে এল।

‘ঝ্যাঁটাটা নিয়ে দেব নাকি দুগাছ, তোরে বলে লাজ হয় না? হারামজাদা!’

‘আরে কি হয়েছে জানিস, বিকুদাদাদের নাকি পাড়ায় আর, রইতে দেবে না। ওর বাপ সেই রাজগেরাম না কোথায় একটা কাজে গেছিল না, এখন এয়ে চুপচাপ ঘরে রয়ে গেছে, কাউরে বলেনি, পরিক্ষেও নাকি করায়নি, কেলাবের ছেলেরা নাকি পুলিস ডাকতে গেছে।’

‘যাগ্গে, তুই খেতে বোস দিকি। কয়টা বাজে দেখেছিস? আগের মাসে লাইটের বিল কত এইয়েছিল জানিস?’

মুখে উড়িয়ে দিলেও মনে মনে একটা চিন্তা হয় মনোর মা-র। বিকুর মা আর ওরা বলতে গেলে একই গেরামের লোক, এ মুলুকে চেনাজানা বলতে আর তো তেমন কেউ নেই। তিনি যাওয়ার বছরখানেকের মধ্যে কারখানার লোকেরাও এ পথ ভুলেছে। এ দুজ্জোগে এমনধারা কথা শুনলে একটু চিন্তা হয় বইকি। হে ঠাকুর, এ কেমন ছিষ্টি তোমার, গরিবে যে আর বাঁচে না। একটু দেখো ঠাকুর মুখ তুলে, ভয় লাগে যে বড়!

দেওয়াল থেকে তেলচিটে পড়া নারায়ণ দেখতে পান কিনা, সে নিয়ে আর কেউ ভাবে না। ওরা কোনোদিনই কোনকিছু নিয়ে বেশি ভাবে না। গরিব-ছোটলোকের বেশি ভাবতে নেই, কখন কার রোষে পড়ে যাবে; কি দরকার বাবা, যেমন ঘষটে ঘষটে চলছে চলুক না।

টেবিলটার নিচে মনো বসে, খাটের ধারটায় করে মা; হাঁড়ি-কুরি সব রাখে খাটের তলায়। মনো ছোটখাটো মানুষ, অসুবিধা হয় না। বাপ থাকতে রোজ বিছনা গুটিয়ে দিত, তারপর তিনজনে গোল হয়ে বসত। এখন আর অত কে করে, গতরে পোষায় না।

খেতে বসে মনোর আবার মনে পড়ে যায়, বলে ‘মা, ওরা না বলছিল যে মুসলমানের জাত; বিকুদাদারা মুসলমান না?’

‘তোরে না বলেছি এসব কথা বলবি না, থাবড়া খাবি।’

তেল দিয়ে ভাতটা মেখে মনোর খেয়াল হল মা’র থালের দিকে। মা যে রোজ কি করে এই রাতের খাবার সময়। মনো বলল ‘রোজ দেখি হাঁড়ির ঢাকনায় এট্টুনি ভাত নিয়ে দু-গেরাসে খেয়ে উঠে যাস। কেন রে, ঘরে চাল কি ফুরিয়ে গেছে? ভাবিস নে, ভোরের বেলা যখন কেউ ওঠেনে, তখন একছুটে গিয়ে পকার দোকান থে এনে দেব’খন। পুলিস-ফুলিস কেউ দেখতেই পাবে না।’

‘হবে’খন, তুই খা তো দিকি।’

‘তুই খাবি নে?’

‘খিদে নেই।’

দ্রুত হাতে বাসনগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে মনোর মা উঠে দাঁড়ায়; জল তোলা আছে, আজ রাতেই মেজে রাখতে হবে। কাল ভোর-ভোর উঠে চা-টুক খেয়েই মন্দিরে লাইন দিতে ছোটা, চালডালের সঙ্গে এট্টু করে তেল, একটা সাবানও নাকি দেবে- তাড়াতাড়ি না গেলে সব ফুরিয়ে যাবে- আকালের বাজার, কত লোকে যাবে। মনো আর মনোর মা’র দুখানা টিকিট কাল দিয়ে গেছে, যত্ন করে রাখা আছে বিছনার নিচে।

পরের দিন সকালে মনোও তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে। মা বেরনোর সময় বলে- ‘ওড়নাখান মুখে বাঁধলিনে যে বড়? পুলিসে ধরবে যেয়ে…’

‘মেলা বকিস নে। খাটের উপরে বসে থাক, নামবিনে, বাইরে দে ছিকল টেনে যাব, উনানে হাত দিবি নে।’

‘তোর আজ ষষ্ঠী না? ঘরে পুজো দিবি, দানাদার আনবি নে?’

‘নোলাখান হয়েছে দেখো না এই অ্যাত্ত বড়; কচুপোড়া নে আসব। কাজের বাড়ি বন্ধ, কবে কে ডাকবে ঠিক নেই, ট্যাকা নেই, এত বড় ছেলে, বুঝিস নে কিছু?’

‘আনবিনে বয়ে গেল আবাগি, আমি তোর কাছে খেতে চেয়েছি নাকি? তোরে শেষ দিনে দুশো টাকা দেছিল না ওই ফেলাটের দাদারা? তোর সব ট্যাকাই শেষ হয়ে যায়, রাক্কুসি!’

রাস্তায় বেরিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল মনোর মা’র। কতই বা বয়স হল, ছোটই তো, দুখানি দানাদার বই তো কিছু বলেনি। ছি, ছি! ফেরার পথে নিয়েই যাবে’খন আজ।

মন্দিরে কাতার দিয়ে লোক এসছে, বাসরে! মাথা গোনা যায় না, সে কি লাইন! এরি মধ্যে পুলিস এসে এসে হুড়ো দিয়ে যাচ্ছে- সরে সরে দাঁড়াও, সরে সরে দাঁড়াও। দুপুর সাড়ে এগারোটা অবধি দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন ছেলেরা এসে বলল মাল শেষ, কুপন থাকলেও আজকে আর দেওয়া যাবে না, তখন মায়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এতক্ষণ যে কত লোকে কত-কত করে নে গেল? বাইকে বসিয়ে, রিকশা করে? আমাদের দুমুঠো চালের কম পড়ল? লোকজনে জড় হচ্ছিল, পুলিস এসে লাঠি উঁচিয়ে সবাইকে সরিয়ে দিল।

ও পাড়ার রাস্তা ঘুরে যখন বাজারে পৌঁছল, তখন বাজারে বেশ ভিড়। হোকগে, দুটো শাক নিয়ে, মিষ্টিটা নিয়েই চলে যাবে, বাড়িতে ছেলেটাও একা রয়েছে। একটা কুমড়ো ডগা, দুটো কাঁচকলা নিয়ে যখন মিষ্টির দোকানের দিকে এগোতে যাবে, তখনই ঘটনাটা ঘটল। পুলিস এসে ভিড় সরাচ্ছিল বেশ কিছুক্ষণ। হেবোর চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছিল হারানের কাকা, পুলিশ দিয়েছে এক রুলের গুঁতো। খালিগায়ে, লুঙি পড়ে দাঁড়িয়েছিল, সামলাতে না পেরে পড়ল গিয়ে ডেরেনের পাশে। আহারে, অমন করে কেউ ঠেলে, বুড়ো মানুষটা? কিন্তু মনোর মা ওদিকে এগোতেই আরেকজন এমন তেড়ে এল, সে পা মচকে পড়ল রাস্তার ধারে। কোনওরকমে হাঁচোরপাচোর উঠেই সে লেংচে লেংচেই দৌড়ল। প্লাস্টিকটা ছিঁড়েছে; তা যাক, কিছু পড়েনি।

ঘরে যখন ঢুকল, তখন মনো ঘুমিয়ে পড়েছে। এই অবেলায় ঘুমায় কেন ছেলেটা? থাকগে ডেকে লাভ নেই। শাকসবজি নামিয়ে, বাতাসাটুকু কৌটোয় ঢালতে ঢালতে মনো উঠল। উঠেও মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল।

‘হাতে করে এট্টু সরষে তেল নে কলপাড়ে যা, জল চলে যাবে।’

‘করবনা চান।’

‘খাবিনে?’

‘না।’

কিছুক্ষণ পর মাকে লেংচাতে দেখে মনো উসখুস করতে থাকে, শেষে আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেলে।

‘তোর জেনে হবে কি?’

‘বলবি নে?’

‘চানটা সেরে আয় আগে।’

কুমড়ো শাক দিয়ে ভাত খেতে খেতে সব কথা শুনে মনো বলে ‘তুই আমাকে ডাকলিনে কেন? এর পর’দিন আমায় নে যাবি, দেখবি সবার আগে গিয়ে নেব, পুলিস কিচ্ছু বলবে না। ঢিল মেরে মাথা ফাটিয়ে দেব না? আমায় নে যাবি, বুঝলি?’

‘সে হবে’খন।’ মুখ নামিয়েই মা উত্তর দেয়।

‘আর তুই বোকার হদ্দ বুঝি ভেবেছিলি আমি মিষ্টি খেতে চেয়েছি? আমি ভাবলাম তোর মনে নেই বোধয়…’

কিছুক্ষণ পর মনোর আবার কি মনে পড়ে, বলে ‘এ হপ্তায় রেশন দিয়েছে?’

‘না।’

‘টিভিতে যে বলল একমাসের রেশন একবারে দেবে?’

‘ওর’ম বলে। দেবে হয়ত পরে।’

‘সব চাল নে চলে যায় না?’

‘কি জানি বাপু…’

‘আমি যখন বড় হবে দেখিস, পলটুদার মত একখান বাইক কিনব। তোরে কেউ কিছু বললে একদম হুশ করে গিয়ে পড়ব না, সব ভয়তে সরে যাবে।’

‘তুই খা মা, আমি হাত ধুয়ে আসি’ বলে মনো উঠে পড়ে। কিছুক্ষণ পর কোথা থেকে হাতে করে একটু চুন নিয়ে আসে। মাকে বলে ‘এত এট্টু গরম করে পায়ে লাগিয়ে নে দেকি, ব্যথা মরবে।’

‘কোত্থেকে পেলি?’

‘বিকুদাদাদের থে নে এলাম।’

‘আবার ওদের ঘরে কেন গেলি? দেখছিস নে এখন সবার ঘরে যেতে বারণ করছে?’

‘ঘরে যাইনি, বাইরে থেকেই নে এলাম’

এখন মানুষের মনে ভয়, কোত্থেকে কি হয়ে যায়। দুশ্চিন্তা হয় মাঝে-সাঝে। কি যে দিন পড়ল, সব কি শেষ হয়ে যাবে? তবে কি পেলয় এসে পড়ল? সেসব বেশিক্ষণ থাকে না; চিন্তা করা সবার জন্য নয়। টিভিতে কত কিছু বলে, একজনের সাবান-গামছা নাকি অন্যে নেবে না, মানুষ পারেও বটে, আসবে কোথা থেকে?

দুপুরবেলা শুয়ে শুয়ে ঘুম আসে না। মনো মাকে বলে ‘সেই দেশের বাড়ির কথা কথা বল মা।’

‘কোন কথা?’

‘সেই যে খেজুরের রস পাড়া হত।’

‘ভোরের বেলা, গাছের থে হাঁড়ি নামানো হত।’

‘তারপর?’

‘সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় হত। পাব্বনের দিন পায়েস হত।’

‘তারপর?’

‘বালতি ভরা দুধ আসত, ধবধবে সরু চাল আসত, এই বড় কাঠের উনুন হত। আর বাস যা ছাড়ত না, গাঁয়ের লোকে টের পেত।’

এই জায়গাগুলো শোনার জন্যই বারবার এই গল্পগুলো শুনতে চাওয়া মনোর। সব কেমন যেন রূপকথার মত- বালতি ভরা দুধ! ধবধবে সরু চাল! শুনলেও যেন সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। বারবার শুনেও যেন আশ মেটে না।

‘তারপর?’

‘তারপর তুই ঘুমো এখন, বসে বসে গল্পে কাল কাটালে আমার চলবে? কাজকম্ম করতে হবে নে?’

গল্প একসময় শেষ হয়ে যায়, লড়াই ফুরিয়ে যায় না।

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s